নিশিদিন তব ডাক শুনিয়াছি মনে মনে (nishidin tobo dak shuniachhi)

নিশিদিন তব ডাক শুনিয়াছি মনে মনে
শ্রবণে শুনিনি আহ্‌বান তব পবনে শুনেছি বনে বনে॥
          হে বিরহী তব আভাস
          পাণ্ডু করেছে তোমার আকাশ
বিজনে তোমারে করিয়াছি ধ্যান শুধা য়ে ফিরিনি জনে জনে॥
সকলে যখন ঘুমায়ে পড়েছে আধ রাতে
স্মৃতি মঞ্জুষা খুলিয়া দেখেছি নিরালাতে।
          যদি তব ছবি ম্লান হয়ে যায়
          অশ্রু সলিলে ধূয়ে রাখি তায়
দেবতা তোমারে মৌন পূজায় নীরবে ধেয়াই নিরজনে॥

  • ভাবসন্ধান: ভক্তের অন্তরের নিভৃত সাধনা, আরাধ্য দেবতার বিরহের বেদনা এবং নীরব উপাসনার গভীর অনুভূতি উপস্থাপিত হয়েছে এই গানে। এখানে ভক্ত ও আরাধ্য দেবতার সম্পর্ক  হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে উৎসারিত প্রেম, স্মরণ ও ধ্যানের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

    গানের শুরুতে ভক্ত দিন-রাত তাঁর অন্তরে তাঁর আরাধ্য দেবতার আহ্বান অনুভব করেন। সেই আহ্বান প্রকৃতির বাতাস, বনভূমি এবং নিস্তব্ধতার মধ্য দিয়ে হৃদয়ে অনুরণিত এক আধ্যাত্মিক ডাক। অর্থাৎ দেবতা নিজেকে প্রকৃতির নীরব সৌন্দর্য ও অন্তরের অনুভূতির মাধ্যমে প্রকাশ করেন। তাই ভক্ত মানুষের কাছে তাঁর পরিচয় খুঁজে বেড়ান নি বরং নির্জনে ধ্যানের মধ্যেই তাঁর সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করেছেন।  

    গানের পরবর্তী অংশে কবি ঈশ্বরকে 'বিরহী' বলে সম্বোধন করেছেন। এখানে দেবতা ভক্তের প্রেম ও মিলনের জন্য আকুল, আবার যাঁর বিরহে ভক্তও ব্যাকুল। এই বিমূর্ত উপস্থিতি সমগ্র আকাশে এক বিষণ্নতার আবহ সৃষ্টি করে। ভক্ত নির্জনে তাঁকে ধ্যান করেন কিন্তু লোকে লোকে ঘুরে তাঁর পরিচয় অনুসন্ধান করেন না। অর্থাৎ প্রকৃত আরাধ্য দেবতাকে বাহ্যিক অনুসন্ধানে পাওয়া যায় না। তাঁকে পাওয়ার জন্য প্রয়োজন অন্তরের সাধনা।

    গানের শেষ কবি এক অপূর্ব ভক্তিময় রূপকল্প দৃশ্যের অবতারণা করেছেন। গভীর রাতে যখন সবাই নিদ্রিত, তখন ভক্ত নিঃসঙ্গভাবে স্মৃতির ভাণ্ডার খুলে প্রিয়তম আরাধ্য দেবতার স্মৃতিচারণ করেন। যদি তাঁর অন্তরের সেই রূপ বা স্মৃতি ম্লান হয়ে যেতে চায়, তবে নিজের অশ্রুজল দিয়ে তা ধুয়ে নির্মল রাখেন। অর্থাৎ ভক্ত তাঁর প্রেম ও বিশ্বাসকে কখনও ম্লান হতে দেন না। শেষ পর্যন্ত তিনি নিঃশব্দ পূজায়, কোনো বাহ্যিক আয়োজন ছাড়াই, একান্ত নির্জনে তাঁর ধ্যান করেন। এখানে 'মৌন পূজা' অন্তরের গভীরতম ভক্তি ও আত্মসমর্পণের প্রতীক।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের আগষ্ট (শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩৪২) মাসে টুইন রেকর্ড কোম্পানি এই গানটির একটি রেকর্ড প্রকাশ করেছিল।  এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৫ বৎসর ২ মাস।
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২) -এর ৪৪৮ সংখ্যক গান।
  • রেকর্ড: টুইন [আগষ্ট ১৯৩৫ (শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩৪২)। এফটি ৪০৩৩। শিল্পী: সান্ত্বনা সেন। সুর: কাজী নজরুল ইসলাম।]
     
  • স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, পঞ্চদশ খণ্ডভাদ্র ১৪০৩। আগষ্ট ১৯৯৬। ২১ সংখ্যাক গান। রেকর্ডে সান্ত্বনা সেন-এর গাওয়া গানের সুরানুসারে স্বরলিপি করা হয়েছে। [নমুনা]
  • সুরকার: নজরুল ইসলাম
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। সাধারণ। দৈবসত্তা। 
    • সুরাঙ্গ: রাগাশ্রয়ী
    • রাগ: পিলু
    • তাল: দাদরা
    • গ্রহস্বর: পা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।