মা তোর কালো রূপের মাঝে রসের সাগর (maa tor kalo ruper majhe rosher sagor)
মা তোর কালো রূপের মাঝে রসের সাগর লুকিয়ে আছে,
তোর কৃষ্ণ জ্যোতির আড়াল টেনে মোর প্রেমময় কৃষ্ণ নাচে॥
(নাচে, নাচে, নাচে গো)
আমি যাঁহার পরম তৃষ্ণা লয়ে কাঁদি (মা),
ওমা কৃষ্ণা কেন রাখলি তারে বাঁধি,
ওমা যোগমায়া সে যে বাজায় বাঁশি তোরই রূপের কদম গাছে॥
আমার অভয় সুন্দরেরে কেন ভয়ের আবরণে
রাখলি ঢেকে মাগো, আমি কাঁদব কত এই বিরহের বৃন্দাবনে।
ওমা তোর শক্তি যমুনারি তীরে
নাম লয়ে মোর শ্যাম যে কেঁদে ফিরে।
তুই কোলে করে মেয়েরে তোর নিয়ে যা তাঁর পায়ের কাছে॥
- ভাবসন্ধান: দেবী কালী ও কৃষ্ণকে একই পরম সত্তার দুই ভিন্ন রূপ। কালীর ভয়ংকর ও কৃষ্ণবর্ণ রূপের অন্তরালে প্রেমময় কৃষ্ণের রস ও সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। ভক্ত বিরহে কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে প্রার্থনা করেন, যেন তিনি তাঁর রহস্যময় শক্তির আবরণ সরিয়ে সেই পরম সুন্দর, প্রেমময় শ্যামের কাছে তাঁকে পৌঁছে দেন। এই গান মূলত শাক্ত সাধনা ও বৈষ্ণব প্রেমভাবের এক গভীর সমন্বয়ের প্রকাশ। এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে শ্যামা বা কালীর কালো রূপের অন্তরালে কৃষ্ণের প্রেমময়, রসময় ও সুন্দর রূপকে উস্থাপন করা হয়েছে। মূকত এই গানে শাক্ত ও বৈষ্ণব ভাবধারার এক অপূর্ব মিলন এখানে ঘটেছে।
গানের শুরুতে কবি বলেছেন- 'মা তোর কালো রূপের মাঝে রসের সাগর লুকিয়ে আছে।' মূলত দেবীর কালো বা ভয়ংকর বাহ্যরূপের অন্তরে যে অসীম প্রেম, আনন্দ ও সৌন্দর্য নিহিত আছে, কবি সেই সত্য উপলব্ধি করেছেন। 'কৃষ্ণ জ্যোতির আড়াল টেনে”' বলতে বোঝানো হয়েছে, কালীর কৃষ্ণবর্ণ বা গভীর রহস্যময় রূপের আবরণের অন্তরালে কবির প্রিয়তম শ্যাম বা কৃষ্ণ যেন নৃত্য করছেন। অর্থাৎ যে কালো রূপকে বাহ্যদৃষ্টিতে ভয়ংকর বলে মনে হয়, তার মধ্যেই প্রেমের চরম সৌন্দর্য বিরাজমান।
কবি যাঁর জন্য পরম আকাঙ্ক্ষায় কাঁদেন, সেই কৃষ্ণকে মা কেন নিজের মধ্যে আবদ্ধ করে রেখেছেন- এই আকুল প্রশ্ন তাঁর। এখানে 'কৃষ্ণা' বলতে দেবী কালীর কৃষ্ণবর্ণ রূপকে সম্বোধন করা হয়েছে। কবি যেন বলছেন- হে মা, আমার প্রিয় শ্যামকে তুমি তোমার রহস্যময় রূপের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছ কেন?
গানটির পরবর্তী অংশে যোগমায়া ধারণাটি এসেছে। যোগমায়া সেই ঐশ্বরিক শক্তি, যিনি জগৎ ও ঈশ্বরের লীলা প্রকাশ করেন। কবির কল্পনায় সেই যোগমায়াই দেবীর রূপের কদমগাছে বাঁশি বাজান। কদমগাছ, বাঁশি ও কৃষ্ণ—এসব বৈষ্ণব প্রেমলীলা ও বৃন্দাবনের প্রতীক। ফলে দেবীর শক্তির মধ্যেই কৃষ্ণলীলার প্রকাশ ঘটেছে।
এরপর কবি তাঁর 'অভয় সুন্দর' অর্থাৎ ভয়হীন, মঙ্গলময় ও সুন্দর প্রিয়তমকে ভয়ের আবরণে লুকিয়ে রাখার অভিযোগ করেছেন। কালীকে সাধারণত ভয়ংকর রূপে দেখা হয়- খড়্গ, মুণ্ডমালা ও শ্মশান তাঁর প্রতীক। কিন্তু কবি জানেন, এই ভয়ংকর আবরণের মধ্যেই তাঁর প্রিয় সুন্দরতম শ্যাম বিরাজ করছেন। তাই তাঁকে দেখতে না পেয়ে কবি বিরহের বৃন্দাবনে কাঁদছেন।
শেষাংশে শাক্ত ও বৈষ্ণব ভাবের মিলন আরও গভীর হয়েছে। 'তোর শক্তি যমুনারি তীরে নাম লয়ে মোর শ্যাম যে কেঁদে ফিরে' 'এখানে দেবীশক্তি ও কৃষ্ণপ্রেমকে একই আধ্যাত্মিক সত্যের দুই দিক হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। যমুনাতীর, শ্যাম ও নামধ্বনি বৈষ্ণব ভাবের প্রতীক; আর শক্তি শাক্ত ভাবের প্রতীক।
সবশেষে কবি নিজেকে মায়ের 'মেয়ে' বা কন্যারূপে কল্পনা করে বলেন- মা, তুমি আমাকে কোলে করে আমার সেই প্রিয়তমের পায়ের কাছে নিয়ে যাও। অর্থাৎ ভক্তের চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা হলো- মায়ের করুণার আশ্রয়ে থেকে তাঁরই অন্তর্নিহিত পরম প্রিয়ের চরণে পৌঁছানো।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৮) মাসে সেনোলা রেকর্ড কোম্পানি গানটি প্রথম রেকর্ড করে। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪২ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮। ৬২৯ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা ১৯১]
- রেকর্ড: সেনোলা [অক্টোবর ১৯৪১ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৮)। কিউএস ৫৩৪। শিল্পী: শৈল দেবী। সুর: নজরুল ইসলাম।] [শ্রবণ নমুনা]
- সুরকার: কাজী নজরুল ইসলাম।
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি: নীলিমা দাস। [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, বত্রিশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। ফাল্গুন ১৪১৫। ফেব্রুয়ারি ২০০৯] ১৪ সংখ্যক গান। রেকর্ডে শৈল দেবী-র গাওয়া গানের সুরানুসারে স্বরলিপি করা হয়েছে। [নমুনা]
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম, শাক্ত। কালী ও কৃষ্ণ। বন্দনা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল: দাদরা
- গ্রহস্বর: সা