বহিছে সাহারায় শোকেরি 'লু' হাওয়া (bohichhe saharay shokeri lu haoya)

বহিছে সাহারায় শোকেরি 'লু' হাওয়া,
দোলে অসীম আকাশ আকুল রোদনে।
নূহের প্লাবন আসিল ফিরে যেন,
ঘোর অশ্রু-শ্রাবণ ধারা ঝরে সঘনে॥
'হায় হোসেনা' 'হায় হোসেনা' বলি'
কাঁদে গিরি নদী, কাঁদে বনস্থলী,
কাঁদে পশু ও পাখি তরুলতার সনে॥
ফকির বাদ্‌শাহ গরীব ওমরাহে
কাঁদে তেমনি আজো তাঁরি মর্সিয়া গাহে,
বিশ্ব যাবে মুছে মুছিবে না এ আঁসু
চিরকাল ঝরিবে কালের নয়নে॥
সেই সে কারবালা সেই ফোরাত নদী
কুল-মুসলিম-হৃদে গাহিছে নিরবধি,
আসমান জমীন রহিবে যতদিন
সবে কাঁদিবে এমনি আকুল কাঁদনে॥

  • ভাবসন্ধান: এই শোকগাথামূলক গানে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার স্মৃতি এবং ইমাম হোসেন (রা.)-এর শাহাদাতকে কেন্দ্র করে সমগ্র মানবজাতির চিরন্তন শোক ও বেদনার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। কবি কারবালার ঘটনাকে কেবল একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখেননি; বরং একে সত্য, ন্যায় ও ধর্মের জন্য আত্মত্যাগের সর্বজনীন প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

    গানের শুরুতেই কবি কল্পনা করেন, যেন কারবালার শোক আজও সাহারা মরুভূমির উত্তপ্ত 'লু'-হাওয়ার সঙ্গে বয়ে চলেছে। সমগ্র আকাশ যেন শোকাকুল হয়ে কাঁদছে, আর সেই কান্নার অভিঘাতে পৃথিবীও বিষণ্ণ। তিনি এই অশ্রুধারাকে হজরত নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ কারবালার বেদনা এতই গভীর যে, মনে হয় আবার যেন পৃথিবী অশ্রুর প্লাবনে নিমজ্জিত হয়েছে।

    এরপর কবি উপস্থাপন করেছেন, এই শোক কেবল মানুষের নয়; প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানও যেন এই বেদনায় অংশীদার। 'হায় হোসেন' ধ্বনি উচ্চারণ করে পর্বত, নদী, বনভূমি, পশু-পাখি ও বৃক্ষলতাও যেন ক্রন্দন করছে। এই চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, ইমাম হোসেনের শাহাদাত এমন এক মহাবিয়োগ, যার অভিঘাত সমগ্র সৃষ্টি অনুভব করে। পরবর্তী স্তবকে কবি বলেন, সমাজের ধনী-দরিদ্র, ফকির-বাদশাহ, সাধারণ মানুষ ও অভিজাত—সকলেই আজও সমানভাবে ইমাম হোসেনের শোকগাথা বা মর্সিয়া গেয়ে তাঁর আত্মত্যাগকে স্মরণ করেন। যুগের পর যুগ অতিক্রান্ত হলেও এই শোকের অশ্রু কখনো শুকায় না।

    কবির ভাষায়, একদিন হয়তো পৃথিবীর বহু কিছু বিলীন হয়ে যাবে, কিন্তু কারবালার জন্য মানুষের চোখের জল এবং ইতিহাসের বেদনাময় স্মৃতি কখনো মুছে যাবে না। কালের প্রবাহও এই শোককে বিস্মৃত করতে পারবে না। শেষ স্তবকে কবি কারবালার প্রান্তর ও ফোরাত নদীর স্মৃতিকে মুসলিম সমাজের হৃদয়ে চিরস্থায়ী বলে বর্ণনা করেছেন। কারবালা শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি সত্য, ন্যায়, ত্যাগ ও ঈমানের প্রতীক। ফোরাত নদী সেই নির্মম ঘটনার নীরব সাক্ষী, যেখানে পানির সান্নিধ্যে থেকেও ইমাম হোসেন (রা.) ও তাঁর সঙ্গীরা তৃষ্ণার্ত অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেছিলেন। তাই আসমান ও জমিন যতদিন থাকবে, ততদিন কারবালার এই শোক, ইমাম হোসেনের আত্মত্যাগ এবং তাঁর আদর্শ মানবহৃদয়ে অম্লান থাকবে এবং মানুষ একইরূপ গভীর শ্রদ্ধা ও বেদনায় তাঁকে স্মরণ করবে। 

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের মে  (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪০) মাসে, গানটি টুইন রেকর্ড কোম্পানি থেকেটুইন রেকর্ড কোম্পানি থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল । এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৩ বৎসর ১১ মাস।
     
  • গ্রন্থ:
    • গুলবাগিচা
      • প্রথম সংস্করণ [১৩ আষাঢ় ১৩৪০, ২৭ জুন ১৯৩৩। দেশ-কাওয়ালী। পৃষ্ঠা: ৯২]
      • নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংকলন। পঞ্চম খণ্ড। বাংলা একাডেমী। ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১। গুল-বাগিচা। গান সংখ্যা ৭৬। দেশ-কাওয়ালি পৃষ্ঠা ২৭১-২৭২]
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইন্সটিটিউট, মাঘ ১৪১৭, ফেব্রুয়ারি ২০১১) নামক গ্রন্থের ৫৯৪ সংখ্যক গান।
  • রেকর্ড: টুইন [মে ১৯৩৩ (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪০)। এফটি ২৫৯৫।  শিল্পী: আব্বাসউদ্দীন আহমদ[শ্রবণ নমুনা]
  • স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। মর্সিয়া
    • সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।