বনের তাপস কুমারী আমি গো, সখি মোর বনলতা (boner taposh kumari ami go, sokhi mor bonolota)

বনের তাপস কুমারী আমি গো, সখি মোর বনলতা।
নীরবে গোপনে দুই জনে কই আপন মনের কথা॥
    যবে  গিরিপথে ফিরি সিনান করিয়া
           লতা টানে মোর আঁচল ধরিয়া,
হেসে বলি, ওরে ছেড়ে দে, আসিছে তোদের বন-দেবতা॥
ডাকি যদি তারে আদর করিয়া 
 ওরে বন বল্লরি,
আনন্দে তার ফোটা ফুলগুলি অঞ্চলে পড়ে ঝরি'।
           লুকায়ে যখন মোর দেবতায়
           আবরিয়া রাখে কুসুমে পাতায়,
চরণে আমার (ও সে) আসিয়া জড়ায় যবে হই ধ্যানরতা॥

  • ভাবসন্ধান: প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক মিলনের মাধুর্য এবং মহিমাকে এক অপরূপ রূপকল্পে চিত্রিত করা হয়েছে। কবি কল্পবিহারে 'বনের তাপস কুমারী' এবং তাঁর সখী হলো বনলতা। ;বনের তাপস কুমারী আমি গো' -এখানে কবি নিজেকে অরণ্যের নির্জন সাধনায় নিমগ্ন এক কুমারীরূপে কল্পনা করেছেন। তাঁর জীবন সরল, নিভৃত এবং প্রকৃতিনির্ভর। বনলতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুধু গাছপালার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নয়; যেন দুই সখীর মধ্যে গভীর হৃদ্যতা।

    কল্পবিহারে গিরিপথে স্নান করে ফেরার সময় সখী বনলতা তাঁর আঁচল ধরে টানে। তাপস কুমারী স্নেহভরা তিরস্কারে বলেন- 'ওরে, ছেড়ে দে, আসিছে তোদের বন-দেবতা।' এখানে কবি অরণ্যের প্রতিটি লতা-পাতা, ফুল ও বৃক্ষের মধ্যে এক জীবন্ত, অদৃশ্য বন-দেবতার উপস্থিতি অনুভব করেন। এই কুমারী যখন তাঁর পরমসত্তারূপী আরাধ্য 'দেবতা'কে ডাকেন, তখন সেই পরমসত্তাই যেন বন-দেবতারূপে আবির্ভূত হয়ে আনন্দে তাঁর ফোটা ফুলগুলি আঁচলে ঝরিয়ে দেয়।

    দেবতা যখন আসেন, তখন বনলতা কুসুম ও পত্র দিয়ে তাঁকে আড়াল করে রাখে। তাপস কুমারী যখন ধ্যানরতা হন, তখন আবার সেই দেবতা এসে তাঁর চরণ জড়িয়ে ধরেন। প্রকৃতির এই নিভৃত পরিবেশে তিনি বাহ্যজগতের চেতনা অতিক্রম করে এক গভীর আত্মিক অনুভূতিতে নিমগ্ন হন। এখানে গানটি একদিকে প্রকৃতির সঙ্গে সখ্যের গান, অন্যদিকে প্রকৃতির মধ্য দিয়ে প্রিয়তম বা পরমসত্তাকে অনুভব করার গান। বনলতা যেমন বাস্তব লতা, তেমনি কবির কল্পনায় সে এক স্নেহময়ী সখী; আর অরণ্যের দেবতা হয়ে ওঠেন সেই রহস্যময় পরমসত্তা, যার উপস্থিতি ও সান্নিধ্যে তাপস কুমারীর অন্তর ধ্যানমগ্ন হয়ে যায়।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় নি।  ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৫) এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি গানটির প্রথম রেকর্ড  করেছিল। পরে তা  বাতিল হয়ে যায়। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৯ বৎসর ৩ মাস।
     
  • রেকর্ড:
    • এইচএমভি [সেপ্টেম্বর ১৯৩৮ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৫)। শিল্পী: প্রতিমা গুপ্ত। সুর: নজরুল ইসলাম। রেকর্ডটি পরে বাতিল হয়ে গিয়েছিল]
    • এইচএমভি [সেপ্টেম্বর ১৯৪০ (১৬ ভাদ্র -১৪ আশ্বিন ১৩৪৭)। এন ২৭০০৫। শিল্পী: যূথিকা রায়। সুর: কমল দাশগুপ্ত] [শ্রবণ নমুনা]
  • স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: আহসান মুর্শেদ [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, ত্রিশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা।  আষাঢ়, ১৪১৩/জুলাই ২০০৬] যূথিকা রায়-এর রেকর্ডে গাওয়া গান অবলম্বনে কৃত স্বরলিপি। ১৮ সংখ্যক গান। [নমুনা]
     
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ভক্তি ও প্রকৃতি
    • সুরাঙ্গ: স্বকীয়
    • তাল: দাদরা
    • গ্রহস্বর: সা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।