আয় মরু পারের হাওয়া নিয়ে যা রে মদিনায় (ay moru parer haoa)

আয় মরু পারের হাওয়া নিয়ে যা রে মদিনায় 
জাত-পাক মুস্তাফার রওজা মুবারক যেথায়॥
মরিয়া আছি দুখে মাশ্‌রেকী এই মুল্লুকে,
পড়ব মাগরিবের নামাজ কবে খানা-এ কাবায়॥
হজরতের নাম তসবি করে যাব রে মিস্‌কিন বেশে
ইসলামের ঐ দ্বীনী ডঙ্কা বাজল প্রথম যে দেশে।
কাঁদব ধরে মাজার শরীফ শুনব সেথায় কান পাতি, 

নবীর মুখে তেমনি কি রে রব ওঠে এ্যায় উম্মতি।
পাক কোরানের কালাম হয়ত সেথা শোনা যায়॥

  • ভাবসন্ধান: ইসলাম ধর্মের অভ্যুদ্বয়ের দেশ মরুপারের আরব-ভূমি। হিজরতের মাধ্যমে নবী মক্কা থেকে মদিনায় এসেছিলেন এবং এখানেই উড়েছিল প্রথম ইসলামের জয় পতাকা। কবি সে মদিনা থেকে বহুদূরে 'মাশ্‌রেকী মুল্লুকে'। কবির ইচ্ছা সেই ইসলামের তীর্থ-ভূমি মদিনাতে গিয়ে নিজেকে ধন্য করেন।  কিন্তু সেখানে যাওয়া ওঠে নি, কিন্তু আকাঙ্ক্ষার ডানা মেলে উড়ে যেতে যান সেখানে। তাই মরুপারের হাওয়ার কাছে তাঁর একান্ত নিবেদন, সে যেন তাঁকে 'মাশ্‌রেকী মুল্লুকে' থেকে মদিনায় নিয়ে যায়। কারণ এই মদিনাতে রয়েছে হজরত মুহম্মদ (সাঃ-এর রওজা (কবরস্থান)।

    এই গানটির অন্তরার প্রথম পঙ্‌ক্তিতে আছে ''মরিয়া আছি দুখে মাশ্‌রেকী এই মুল্লুকে'। ধারণা করা যেতে পারে- এ গানটি রচনা সময় কবি 'মাশ্‌রেকী মুল্লুকে' ছিলেন। যার মরু হাওয়াকে কবি নবীর রওজায় নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। মূলত আরবের পূর্বাঞ্চলকে মাশ্‌রিক বা মাশরেকি মুল্লুক বলা হয়। কাব্যিক অর্থে-সূর্যোদয়  বা আলোকিত দেশ। অন্য অর্থে আরব থেকে বা পূর্ব দিকের দেশ। এই অঞ্চলের ভিতরে ধরা হয়, বাহরাইন, মিশর, ইরাক (মেসোপটেমিয়া), জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, লিবিয়ার পূর্বাংশ, ওমান, কাতার, সৌদি আরব,  ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইয়েমেন।

    এই গানটির 'মরিয়া আছি দুখে মাশ্‌রেকী এই মুল্লুকে' পাঠ করে মনে হয়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বাঙালি পল্টনে থাকাবস্থায়- কবি মেসোপটেমিয়া (বরতমান ইরাক) গিয়েছিলেন। কবি যুদ্ধে মেসোপটেমিয়া গিয়েছিলেন কি না এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, এই গানের বিচারে ধরেই নেওয়া যায়, গানটি রচনার সময় তিনি- মেসোপটেমিয়া বা এই অঞ্চলের কাছাকাছি 'মাশ্‌রেকী মুল্লুকে'র কোথাও ছিলেন। বলাই বাহুল্য, গানটির রচনাকাল বা রচনাস্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। অনেক পরে  ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানি গানটি প্রকাশ করেছিল।

    কবির আক্ষেপ তিনি মদিনার এতো কাছে এসেও 'মাশ্‌রেকী মুল্লুকে' মরার মতো পরে আছেন। তাঁর আক্ষেপ, কবে তিনি মাগরেবের নামাজ পড়বেন খানা-এ কাবায় (কাবা শরিফে)।  কবির ইচ্ছা, তিনি মিসকিনের (দরিদ্র) বেশে হজরতের নামকে তসবি করে মদিনায় যাবেন, যেখানে প্রথম ইসলামের ইমানি বিজয়ধ্বনিতে মুখরিত হয়েছিল।

    কবির ইচ্ছা তিনি মদিনায় হজরতের মাজারে তাঁর দীনতা নিয়ে কাঁদবেন। হয়তো তিনি  মাজরের পাশে বসে- নবীর কণ্ঠে গায়েবি ধ্বনি -এ্যায় উম্মতি (হে আমার অনুসারী) শুনতে পাবেন। কবির কল্পলোকে নিজের কাছেই জিজ্ঞাসা রাখেন- যেখানে কি এখনো 'এ্যায় উম্মতি' ধ্বনি এবং পাক কোরানের কালাম শোনা যায়॥
     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।  ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৩৯) মাসে মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৩ বৎসর ৩ মাস।
     
  • গ্রন্থ:
    • জুলফিকার
      • প্রথম সংস্করণ। ১৫ অক্টোবর ১৯৩২ (শনিবার ২৯ আশ্বিন ১৩৩৯) মাঢ়-মিশ্র-দাদরা] ।
      • নজরুল রচনাবলী,  জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। চতুর্থ খণ্ড। বাংলা একাডেমী, ঢাকা।  জ্যৈষ্ঠ ১৪১৪, মে ২০০৭,  জুলফিকার। ১৭ সংখ্যক গান। মাঢ়-মিশ্র-দাদরা। পৃষ্ঠা: ৩০১-৩০২]
  • পত্রিকা: মোহাম্মদী [আশ্বিন ১৩৩৯। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৩২]
  • রেকর্ড: এইচএমভি [সেপ্টেম্বর ১৯৩২ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৩৯)। এন ৭০২৭। শিল্পী: কাশেম মল্লিক][শ্রবণ নমুনা]
  • [খায়রুল আনাম শাকিল (শ্রবণ নমুনা)]
  • স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: আহসান মুর্শেদ [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, সাতাশ খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। কার্তিক, ১৪১২/অক্টোবর ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দ] ১৩ সংখ্যক গান [নমু্না]
  • সুরকার: কমল দাশগুপ্ত
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। আকাঙ্ক্ষা
    • সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের গান
    • তাল: দাদরা
    • গ্রহস্বর: রা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।