আসল যখন ফুলের ফাগুন (aslo jokhon fuler fagun)
আস্ল যখন ফুলের ফাগুন, গুল্-বাগে ফুল চায় বিদায়।
এমন দিনে বন্ধু কেন বন্ধুজনে ছেড়ে যায়॥
মালঞ্চে আজ ভোল না হতে বিরহী বুলবুল কাঁদে,
না ফুটিতে দলগুলি তার ঝরল গোলাব হিম-হাওয়ায়॥
পুরানো গুল-বাগ্ এ ধরা, মানুষ তাহে তাজা ফুল,
ছিঁড়ে নিঠুর ফুল-মালী আয়ুর শাখা হতে তায়॥
এই ধুলিতে হল ধূলি সোনার অঙ্গ বে-শুমার,
বাদশা অনেক নূতন বধূ ঝরল জীবন-ভোরবেলায়॥
এ দুনিয়ার রাঙা কুসুম সাঁজ না হতেই যায় ঝ’রে,
হাজার আফ্সোস, নূতন দেহের দেউল ছেড়ে প্রাণ পালায়॥
সামলে চরণ ফেলো পথিক, পায়ের নীচে মরা ফুল
আছে মিশে এই সে ধরার গোরস্থান এই ধূলায়॥
হল সময় – লোভের ক্ষুধা মোহন মায়া ছাড় হাফিজ,
বিদায় নে তোর ঘরের কাছে দূরের বঁধু ডাকছে আয়॥
- ভাবসন্ধান: এটি সুফি দর্শনের বিচ্ছেদী বা চিরবিদায়ের গান। পার্থিব মরণশীল মানুষকে এক সময় পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরমসত্তার কাছে ফিরে যেতে হয়। তার এই চির বিদায়ে আত্মীয় পরিজনের হৃদয়ে প্রিয়জনের জন্য জাগে বিদায়ী হাহাকার। কবি নানা রূপকতায় এই বিদায়বিধুর হাহাকারকে উপস্থাপন করেছেন এই গানে। একই সাথে সতর্ক বার্তায় জানিয়েছেন- লোভ লালসা ত্যাগ করে চিরবিদায়ের জন্য সাবইকে প্রস্তুত থাকার জন্য।
পর্ম স্রষ্টার সৃষ্টি মানব রূহ হলো অসংখ্য রূহের বাগানে ফোটা পুষ্পতুল্য। এদের বর্ণাঢ্য উপস্থিতিতে পার্থিব জগত ভরে ওঠে বসন্তের গোলাপ-বাগিচার মতো। বসন্তের পুস্পিত বাগানে যখন ফুল-ফোটানো ফাল্গুন আসে, তখন কোনো এক বিশেষ পুষ্পের বিদায়ে নেমে আসে হাহাকার। কবির আবেগ তাড়িত আক্ষেপ সেখানেই। কেন এমন দিনে তাঁর বন্ধু অন্যান্য বন্ধুদের কাছে বিদায় চেয়ে চিরতরে চলে যায়। গোলাপের কুঁড়ি প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই মৃত্যু হিম হাওয়া সে ঝরে পড়ে। তাই এমন বর্ণ্যাঢ্য দিনে বন্ধুর চলে যাওয়ার বেদনায় যেন ভোর বেলা থেকেই তার প্রেমের গান কান্না হয়ে ঝরে পড়ে।
পৃথিবীর বহুদিনের এই গোলাপ বাগনে, মানুষ তাজা ফুল হয়ে প্রস্ফুটিত হয়। তারপর একসময় ফুলমালী (পরমস্রষ্টা) নিষ্ঠুর হাতে আয়ুর শাখা থেকে ফুলোগুলো একে একে ছিঁড়ে নেন। এই বিধি থেকে বাদশা, নববধূ কারো রেহাই নেই। তারা তাদের জীবনের পাঠ চুকিয়ে জীবনের প্রভাত বেলায় ঝরে পড়ে। তাদের অগণিত সোনার অঙ্গ, ধূলির সাথে মিশে ধূলি হয়ে গেছে। এই দুনিয়ার অনেক রাঙা কুসম-তুল্য মানুষ জীবন-সন্ধ্যা আসার আগেই ঝরে পড়েছে। হাজার অনুতাপ সত্বেও তাদের নতুন দেহমন্দির ছেড়ে প্রাণ পাখি পালিয়ে গেছে। এইট অমোঘ বিধি।
গানটির শেষে এসে কবি জীবনের চলার পথে সাবধানে পা ফেলার জন্য সতর্ক করছেন সবাইকে। মৃত্যকে ভুলে যারা পার্থিব লোভ লালসার মোহন মায়ায় ডুবে আছে, তাদের জন্য এই সতর্ক বার্তা রেখেছেন এই গানের শেষের চারটি পঙ্ক্তিতে। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে,- তাদের চলার পথে পায়ের নিচে কত মৃত মানুষের (মরা ফুল) দেহ মিশে আছে, পৃথিবীর গোরস্তানের ধূলার সাথে। কবি এই গানের ভণিতায় বলছেন- লোভের ক্ষুধা মোহন মায়া ত্যাগ কর হাফিজ, দূরের বন্ধু (পরমসত্তা) ডাকছে এবং পার্থিব সংসার থেকে শেষে এবং শেষ বিদায় নে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে প্রকাশিত 'নজরুল গীতিকা' গ্রন্থে গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩১ বৎসর ৩ মাস। ওমর খেয়ামের দুটি রুবাই- নিয়ে এই গানটি তৈরি করা হয়েছিল।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-গীতিকা
- প্রথম সংস্করণ [ভাদ্র ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ। ২ সেপ্টেম্বর ১৯৩০। দীওয়ান-ই হাফিজ গীতি। ৫। দুর্গা-মান্দ-কাওয়ালী। পৃষ্ঠা ১৩ ]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। তৃতীয় খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ঢাকা ফাল্গুন ১৪১৩/মার্চ ২০০৭] নজরুল গীতিকা। দীওয়ান-ই হাফিজ গীতি। ১৩। দুর্গা-মান্দ-কাওয়ালী। পৃষ্ঠা: ১৭৮]
- শ্রবণ নমুনা: নীলুফার ইয়াসমীন [শ্রবণ নমুনা]
- নজরুল-গীতিকা
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। সুফিদর্শন। মৃত্যু।
- সুরাঙ্গ: গজল