ছি ছি ছি কিশোর হরি, হেরিয়া লাজে মরি (chhi chhi chhi kishor hori, heriya laje mori)

ছি ছি ছি কিশোর হরি, হেরিয়া লাজে মরি
সেজেছ এ কোন রাজ সাজে
যেন সঙ্ সেজেছ, হরি হে যেন সঙ সেজেছ

ফাগ মুছে তুমি পাপ বেঁধেছ হরি হে যেন সঙ্ সেজেছ;
সংসারে তুমি সঙ্ সাজায়ে নিজেই এবার সঙ্ সেজেছ।
বামে শোভিত তব মধুরা গোপিনী নব
সেথা মথুরার কুবুজা বিরাজে।
মিলেছে ভাল, বাঁকায় বাঁকায় মিলেছে ভাল,
ত্রিভঙ্গ অঙ্গে কুবুজা সঙ্গে বাঁকায় বাঁকায় মিলেছে ভাল।
হরি ভাল লাগিল না বুঝি হৃদয়-আসন
তাই সিংহাসনে তব মজিয়াছে মন
প্রেম ব্রজধাম ছেড়ে নেমে এলে কামরূপ
হরি, এতদিনে বুঝিলাম তোমার স্বরূপ
তব স্বরূপ বুঝি না হে
গোপাল রূপ ফেলে ভূপাল রূপ নিলে স্বরূপ বুঝি না হে।
হরি মোহন মুরলী কে হরি’ নিল
কুসুম কোমল হাতে এমন নিঠুর রাজদণ্ড দিল
মোহন মুরলী কে হরি।
দণ্ড দিল কে, রাধারে কাঁদালে বলে দণ্ড দিল কে
দণ্ডবৎ করি শুধাই শ্রীহরি দণ্ড দিল কে
রাঙা চরণ মুড়েছে কে সোনার জরিতে
খুলে রেখে মধুর নূপুর, হরি হে খুলে রেখে মধুর নূপুর।
হেথা সবাই কি কালা গো?
কারুর কি কান নাই নূপুর কি শোনে নাই, সবাই কি কালা গো
কালায় পেয়ে হল হেথায় সবাই কি কালা গো।
তব এ রূপ দেখিতে নারি, হরি আমি ব্রজনারী,
ফিরে চল তব মধুপুর
সেথা সকলি যে মধুময়, অন্তরে মধু বাহিরে মধু
সেথা সকলি যে মধুময় 
 ফিরে চল হরি মধুপুর।

  • ভাবসন্ধান: কংস বধের জন্য কৃষ্ণ বৃন্দাবন ছেড়ে মথুরায় এসেছিলেন। এরপর তিনি মথুরাতে বসে রাজাকার্য পরিচালনা শুরু করেন। ফলে বৃন্দাবনে হয়ে উঠেছিল নিরানন্দে ভরা বিষাদিত জনপদ। এই বেদনা থেকে কোনো কৃষ্ণ-প্রণয়িনী ব্রজনারীর তাঁর আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন এই গানের  সুর ও বাণীতে।

    মথুরার রাজসিংহাসনে রাজবেশে কৃষ্ণকে দেখে এই ব্রজনারী কৃষ্ণকে ধিক্কার জানিয়েছেন। তাঁর কাছে মনে হয়েছে কৃষ্ণ প্রেমের ফাগ মুছে ফেলে সঙ সেজে পাপ করেছেন। তিনি সংসারকে তিনি সঙ সাজায়ে যেন তিনি সঙের বেশ ধারণ করে মথুরার সিংহাসনে আসীন হয়েছেন। স্মৃতিকাতরতায় মূহ্যমানা এই ব্রজনারী বৃন্দাবনের সাথে মথুরার তুলনা করেছেন পরম ব্যথাতুরা হয়ে। যেখানে বৃন্দাবনে তাঁর বামা পাশে শোভিতা ছিলেন মধুরা নব-গোপিনীরা, সেখানে স্থান পেয়েছে মথুরার কুব্জা নারী (যাকে কৃষ্ণ সুরূপ দিয়েছিলেন)। কৃষ্ণের নৃত্যরূপকে বলা হয় ত্রিভঙ্গ। তাই ব্রজনারী ব্যঙ্গ করে বলেছেন কুব্জার বঙ্কিম দেহভঙ্গির সাথে কৃষ্ণের ত্রিভঙ্গ রূপ যেন মিলে গেছে।

    ব্রজনারী অভিমান ভরে বলেছেন- হয়তো ব্রজনারীদের হৃদয় সিংহাসন তাঁর ভালো লাগতো না বলে, কৃষ্ণ রাজসিংহাসনে আসক্ত হয়েছেন। প্রেমের ব্রজধাম ছেড়ে তাই তিনি সিংহাসনের কামনায় হৃদায়সনে ত্যাগ করেছেন। এই ব্রজনারী বুঝে উঠতে পারছেন না, কৃষ্ণ কেন গোপালের রূপ ত্যাগ করে ভূপালের (রাজা) সঙ সাজলেন। কে তাঁর হাতের মুরলী হরণ করে, তাঁর কুসুম কোমল হাতে নিঠুর রাজদণ্ড তুলে দিল। রাধাকে কাঁদানোর জন্য কে এমন রাজদণ্ড দিল তাঁর হাতে, এই নারী দণ্ডবৎ প্রণাম করে সে কথাই কৃষ্ণের কাছে জানতে চেয়েছেন। জানতে চেয়েছেন কে তাঁর রাঙা চরণের নূপুর খুলে সোনার জরিতে জড়িয়েছেন। এই নারীর সন্দিহান যে, তাঁর নূপুরের মধুর ধ্বনি শোনে নাই, তবে কি তারা সবাই বধির।

    সব শেষে এই ব্রজনারী তাঁর আত্মপরিচয় দিয়ে বলছেন- তিনি ব্রজনারী। কৃষ্ণের এই বিকৃত রূপ সহ্য না করতে পেরে- তিনি পরম বেদনাজড়িত আক্ষেপের সুরে সেই ব্রজধাম তথা মধুপুরে যেতে বলেছেন, কারণ যেখানে সকলি মধুময়, অন্তরে মধু বাহিরে মধু।
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর  (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৭) মাসে সেনোলা রেকর্ড কোম্পানি থেকে এই গানটির প্রথম রেকর্ডে প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৪১ বৎসর ৩ মাস।
     
  • রেকর্ড: সেনোলা সেপ্টেম্বর ১৯৪০ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৭) কি্‌উ,এস ৪৮৭। শিল্পী: নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায়। সুর: নজরুল ইসলাম। [শ্রবণ নমুনা]
     
  • স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি: আহসান মুর্শেদ।  নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি (ঊনবিংশ খণ্ড)। ১৪ সংখ্যক গান] [নমুনা]
     
  • সুরকার: নজরুল ইসলাম
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ:  ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণপ্রেম। তিরস্কার
    • সুরাঙ্গ: কীর্তনাঙ্গ

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।