জয় পীতাম্বর শ্যাম সুন্দর মদন (joy pitambor shyam shundor)

উভয়ে : জয় পীতাম্বর শ্যাম সুন্দর মদন মনোহর কাননচারী।
গোপী-চন্দন আমোদিত তনু বনমালী হরি বংশীধারী॥
ধ্রু : চাঁচর চিকুরে শোভে শিখী-পাখা,
বাঁকা ত্রিভঙ্গিমা চারু নয়ন-বাঁকা।
সু : ও বাঁকা রূপ যেন মর্মে রহে আঁকা
মনে বিরহ কালা বন-বিহারী॥
সু : ভক্তি প্রেম প্রীতি তব রাঙা পায়
ধ্রু : নূপুর হ’য়ে হরি, যেন বাজিয়া যায়,
সু : জনমে জনমে কৃষ্ণ-কথা গায়
যেন এ দেহ মন শুকসারী॥

  • ভাবসন্ধান:  ‘ধ্রুব’ নামক চলচ্চিত্রে গানটি ব্যবহৃত হয়েছিল ধ্রুব ও সুনীতির দ্বৈতসঙ্গীত হিসেবে। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের রূপ, গুণ এবং তাঁর প্রতি ভক্তের আত্মসমর্পণের এক অপূর্ব বহিঃপ্রকাশ। এই পদে ভক্ত হৃদয়ের ব্যাকুলতা এবং শ্রীকৃষ্ণের মোহন রূপের বর্ণনা ফুটে উঠেছে। কৃষ্ণপ্রেমে বিভোর ভক্ত আত্মনিবেদনের অর্ঘে ধ্বনিত হয়েছে জয়ধ্বনী।

    শুরুতে শ্রীকৃষ্ণকে 'পীতাম্বর' (পীত বস্ত্র পরিহিত), 'শ্যাম সুন্দর', এবং 'মদন মনোহর' (যিনি কামদেবকেও মোহিত করেন) বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে। তিনি বৃন্দাবনের কাননচারী এবং বনমালী, তাঁর অঙ্গে গোপী-চন্দনের সুগন্ধ কণ্ঠে বনফুলের মালা। কৃষ্ণপ্রেমে বিভোর ভক্তের আত্মনিবেদন।

    কৃষ্ণের মনোহর রূপ বর্ণায় তাঁর মাথার ময়ূরের পুচ্ছ, তাঁর ত্রিভঙ্গ রূপ এবং হাতে মোহন বাঁশি—এই রূপটি ভক্তের হৃদয়ে এক অপার্থিব প্রশান্তি জাগিয়ে তোলে। তাঁর সেই বিখ্যাত ‘ত্রিভঙ্গ’ অবয়ব এবং চপল নয়ন ভক্তের মনকে গভীরভাবে মোহিত করে। সংসারের বিরহ-বেদনার মাঝেও যেন শ্রীকৃষ্ণের এই বন-বিহারী রূপটিই একমাত্র সান্ত্বনা হয়ে বিরাজ করে।

    ভক্ত কৃষ্ণপদে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিতে চান। ভক্তের আকুতি—তিনি যেন কৃষ্ণের রাঙা চরণে নূপুর হয়ে বাজতে পারেন। এখানে 'নূপুর' হওয়ার বাসনাটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। মূল কথা ভক্ত যেন তাঁর প্রতি পদক্ষেপে কৃষ্ণের সান্নিধ্য অনুভব করতে পারেন। ভক্ত সবসময় ঈশ্বরের সান্নিধ্যে থাকতে চায় এবং কৃষ্ণের ইচ্ছায় নিজেকে পরিচালিত করতে চায়।  তাঁর দেহ ও মন যেন শুক-সারী (পাখি) হয়ে জন্ম-জন্মান্তর কেবল কৃষ্ণনাম ও কৃষ্ণের মহিমা গান করে যায়। ভক্তের দেহ ও মন যেন কৃষ্ণের গুণকীর্তনেই নিবেদিত থাকে, এটিই যেন তাঁর পরম প্রাপ্তি।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জানুয়ারি ‘ধ্রুব’ নামক চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। এই চলচ্চিত্রে গানটি ব্যবহৃত হয়েছিল। ধারণা করা হয়, কাজী নজরুল ইসলাম এই চলচ্চিত্রের জন্য ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের কোনো এক সময়ে এই গানটি রচনা করেছিলেন।   এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ৭ মাস।
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৮১১।  ‘ধ্রুব’ (ধ্রুব ও সুনীতির গীত) পৃষ্ঠা: ৫৩৭]
     
  • চলচ্চিত্র: ধ্রুব। ক্রাউন টকি হাউস।  ১ জানুয়ারি ১৯৩৪ (সোমবার, ১৭ পৌষ ১৩৪০)। ধ্রুব ও সুনীতির গান। শিল্পী: আঙ্গুরবালা ও মাস্টার প্রবোধ]
     
  • পত্রিকা: নাচঘর [৭ পৌষ ১৩৪০ (শুক্রবার, ২২ ডিসেম্বর ১৯৩৪)]
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। আত্মনিবেদন

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।