জয় ভারতী শ্বেত শতদল বাসিনী (joy varoti shwet shotodol bashini)

জয় ভারতী শ্বেত শতদল বাসিনী,
বিষ্ণু-শরণ-চরণ আদি বাণী।
কণ্ঠ-লীনা বাজিছে বীণা,
বিশ্ব ঘু’রে গাহে সে সুরে জয় জয় বীণাপাণি॥
শুনি সে-সুর অন্ধ নভে
উদিল গ্রহ তারকা সবে,
মাতিল আলো-মহোৎসবে মা, বিশ্বরানী॥
আদি সৃজন-দিনে অন্ধ ভুবনে,
তোমার জ্যোতি আলো দিল মা নয়নে।
জ্ঞান-পদায়িনী হৃদয়ে আলো দিলে,
ধেয়ান-সুন্দর করিলে সব নিখিলে,
উর মা উর আঁধার-পুরে আলো দানি’॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানটিতে বিদ্যাদেবী সরস্বতীকে বন্দনা করা হয়েছে। গানটির শুরুতে দেবীকে ভারতী নামে জয়ধ্বনি দেওয়া হয়েছে। 'ভারতী' শব্দের মূল ধাতু হলো 'ভৃ', যার অর্থ বহন করা। দেবী সরস্বতী যেহেতু জ্ঞান, শিল্প এবং প্রজ্ঞার আধার এবং তা জগতের কাছে পৌঁছে দেন, তাই তাঁকে 'ভারতী' বলা হয়। আবার সরস্বতী হলেন 'বাক-দেবী' বা বাণীর দেবী। 'ভারতী' শব্দের অন্যতম অর্থ হলো বাণী বা অলঙ্কারপূর্ণ ভাষা। শুদ্ধ এবং মার্জিত ভাষার উৎস হিসেবে তাঁকে এই নামে অভিহিত করা হয়।

    এই ভারতী শব্দের পরে ব্যবহার করা হয়েছে-শ্বেত শতদল বাসিনী। আক্ষরিক অর্থে সরস্বতী শ্বেত শতদলে (পদ্মফুলে) আসীন। অন্তর্নিহিত অর্থ হলো- সাদা রঙ হলো শান্তি, শুদ্ধতা এবং স্বচ্ছতার প্রতীক। যেহেতু তিনি বিদ্যার দেবী, তাই তাঁর শ্বেত শুভ্র বসন এবং শ্বেত পদ্মে অবস্থান তাঁর পরম পবিত্রতা ও স্বচ্ছ জ্ঞানকে প্রকাশ করে।

    গানটির দ্বিতীয় পঙ্‌ক্তিতে বলা হয়েছে- বিষ্ণু-শরণ-চরণ আদি বাণী। 'আদি বাণী' বা সৃষ্টির আদি শব্দ হিন্দু শাস্ত্র মতে, সৃষ্টির শুরুতে যখন কিছুই ছিল না, তখন প্রথম যে কম্পন বা শব্দের সৃষ্টি হয়েছিল, তাকে বলা হয় 'নাদব্রহ্ম' বা 'আদি বাণী'। দেবী সরস্বতী হলেন এই আদি বাণীর সাকার রূপ। বিষ্ণু হলেন জগতের পালনকর্তা, তাই তাঁর সংকল্প থেকে উৎপন্ন এই আদি বাণী (সরস্বতী) জগতের সমস্ত জ্ঞান ও চেতনার উৎস হিসেবে কাজ করে। মূল বিষয় হলো- তিনি বিষ্ণুর চরণাশ্রিতা এবং সৃষ্টির আদি উৎস বা শব্দরূপী জ্ঞান, তাই তাঁকে এই বিশেষণে ভূষিত করা হয়।

    তৃতীয় পঙ্‌ক্তিতে রয়েছে, কণ্ঠ-লীনা বাজিছে বীণা। সরস্বতী কেবল হাতের বীণা বাজান না, তিনি মানুষের কণ্ঠেও 'বাণী' রূপে অবস্থান করেন। দেবী কণ্ঠে লীন (মিশে যাওয়া) হয়ে তাঁর বাণী ও সুরের জাদু ছড়াচ্ছেন। সেই বাণী বিশ্বজুড়ে সকল মানুষের মুখে বাণী ও সুরের মহিমান্বিত হয়ে বীণাপাণি [বীণা পাণিতে (হাত) যার] ঘুরে বিচরণ করেন।

    দেবীর সেই সুর শুনে মানুষ নয়, অন্ধকার আকাশের বুকে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে গ্রহ-তারকারাশি। জগৎ প্লাবিত হয়ে ওঠে জ্ঞান সৌন্দর্যের আলোকরাশিতে। তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বের রানী।

    সৃষ্টির আদিতে যখন বিশ্বচরাচর ছিল অন্ধকারে নিমজ্জিত। দৃষ্টিও তাই ছিল অন্ধ। দেবী সে চোখে এনে দিলেন জ্যোতি। তিনি জ্ঞান-প্রদায়িনী হয়ে হৃদয়ে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে দিলেন। সমগ্র চরাচর ধ্যান-সুন্দর করলেন তিনি।

    গানটির শেষে রয়েছে জ্ঞানহীন জগতের অন্ধকারে দশায় ব্যথিত কবির প্রার্থনা। তিনি দেবীকে আহ্বান করেছেন জ্ঞান-প্রদায়িনী রূপে। যেন তিনি জ্ঞানহীন জগতের অন্ধপুরীতে অবতীর্ণ হয়ে- জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত করেন।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। অলকা পত্রিকার '২ চৈত্র ১৩২৮‌ (বৃহস্পতিবার ১৬ মার্চ ১৯২২) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। এই  সময় নজরুলের বয়স ছিল ২২ বৎসর ১০ মাস।
     
  • পত্রিকা: অলকা। (বারানসী থেকে সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য সম্পাদিত পত্রিকা)। ২ চৈত্র ১৩২৮ (বৃহস্পতিবার ১৬ এপ্রিল ১৯২২)। শিরোনাম- ভারতী-আরতি।
     
  • গ্রন্থ:
    • প্রলয়শিখা
      • প্রথম সংস্করণ [আগষ্ট ১৯৩০, শ্রাবণ ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ। ভারতী-আরতি। গান।  ]
      • নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। চতুর্থ খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ঢাকা মে ২০১১।  প্রলায় শিখা।  ভারতী-আরতি। গান। তিলক-কামোদ ও শুভাবতী- সাদ্রা-গীতাঙ্গী। পৃষ্ঠা: ১০১]
  • পর্যায়:

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।