জয় শঙ্কর-শিষ্যা, কশ্যপ-দুহিতা মনসা (joy shonkor-shishya, koshyop-duhita monosha)

জয় শঙ্কর-শিষ্যা, কশ্যপ-দুহিতা মনসা।
জয় নাগেশ্বরী জয় অনন্ত নাগ-গণ পুজিতা মনসা॥

প্রখর তপস্বিনী নাগেন্দ্র-বন্দো
সর্প-নৃত্যময়ী বিচিত্র ছন্দে
জ্যোতি সঞ্চারিণী পাতাল-রন্ধ্রে
ফণি-মণি-বিভূষণে ভূষিতা মনসা॥
সর্বলোকে রিপু-নাগ-ভয়-হারিণী
ব্রহ্ম তেজোময়ী প্রদীপ্তা যোগিনী
অনন্ত-অনুজা আস্তিক-জননী
জরুৎকারু-ঋষি-দয়িতা মনসা॥
হরি-হর-সেবিকা বিষহরি মাগো
এ দেহের পাপ-বিষ হর হর জাগো!
(সব) মন্ত্র-অধীশ্বরী ধুতুরা-বর্ণা
প্রসীদ যোগী মুনি-সেবিকা মনসা॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানটি দেবী মনসার একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং শাস্ত্রীয় বন্দনা। প্রচলিত লোকগাথার বাইরে দেবী মনসাকে এখানে পৌরাণিক ও আধ্যাত্মিক মহিমায় উপস্থাপন করা হয়েছে। এই গানে মনসাকে নানা নামে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার পিছনে রয়েছে- পৌরাণিক তত্ত্ব কথা। গানটির প্রায় পুরো অংশ জুড়ে রয়েছে মনসার বিবিধ নামের মধ্য দিয়ে, তাঁর মহিমা উপস্থাপন করা হয়েছে। দেবীভাগবত পুরাণের নবম স্কন্দে তাঁর নামের মহিমা এবং অন্যান্য বিষয়াদি নিয়ে বিস্তারিত বল হয়েছে। যেমন-
    • কশ্যপ দুহিতা ও মনসা: ধ্যনমগ্ন কশ্যপের মনোলোক থেকে এই দেবীর জন্ম হয়েছিল বলে, তিনি 'কশ্যপ-দুহিতা' নামে অভিহিতা হয়েছেন। তিনি কশ্যপের মানস কন্যা বলেই তিনি মনসা। অন্য অর্থে- মানুষের মনে লীলা করেন এই অর্থে তিনি মনসা।
    • শঙ্কর শিষ্যা ও আর জন্মের পর শঙ্করের (শিব) কাছে যৌগমার্গের শিক্ষা গ্রহণ করে সিদ্ধিযোগ লাভ করেছিলেন। তাই তাঁকে 'শঙ্কর শিষ্যা'  নামে  অভিহিতা করা হয়েছে।
    •  নাগেশ্বরী ও অনন্ত নাগগণ পূজিতা : রাজা জন্মজয়ের সর্পযজ্ঞে নাগদের জীবন রক্ষা করায় তিনি নাগেশ্বরী (নাগদের ঈশ্বরী)) নামপ্রাপ্তা হন। এই কারণে নাগ বংশের অনন্তনাগ এবং অন্যান্য নাগ-অধিপতিদের দ্বারা বন্দিতা এবং পূজিতা। তাঁর চলন গতি ও ছন্দ সর্পের নাচের মতো সাবলীল ও বিচিত্র।
    • জ্যোতি সঞ্চারিণী: অন্ধলকার পাতল তথা নাগলোকে আলোকদায়িনী, তাই তাঁকে বলা হয়েছে  'জ্যোতি সঞ্চারিণী পাতাল-রন্ধ্রে'।
    • ফণি-মণি-বিভূষণ: আর তাঁর অলঙ্কার হলো সাপের মাথার মহামূল্যবান মণি, তাই তিনি 'ফণি-মণি-বিভূষণ'।
    • রিপু-নাগ-ভয়-হারিণী: পুরাণ মতে- মনসাদেবীর পূজার সময় তাঁর ১২টি নামের স্তব করলে সর্পভয় থাকে না। এছাড়া তাঁর স্মরণ করলে সর্পভয় বিদূরিত হয়। তাই তিনি- ' রিপু-নাগ-ভয়-হারিণী'তিনি মানুষের ভেতরের নাগরূপী ষড়রিপুর ভয় থেকে ভক্তকে রক্ষা করেন।
    • ব্রহ্ম তেজোময়ী প্রদীপ্তা যোগিনী:  তিনি ব্রহ্ম তেজোময়ী,  এবং যোগিনী রূপে প্রদীপ্তা। কারণ তিনি শিবের কাছে সিদ্ধযোগ লাভ করায়- সিদ্ধ-যোগিনী নামপ্রাপ্তা হয়েছিলেন।
    • অনন্ত-অনুজা: তিনি নাগদের বোন ছিলেন তাই এই নামপ্রাপ্তা হয়েছিলেন। এই সূত্রে তিনি অনন্ত নাগের ভগিনী।
    • আস্তিক-জননী ও জরুৎকারু-ঋষি-দয়িতা মনসা: তিনি ছিলেন জরুৎকারু ঋষির পত্নী। তাই তিনি 'জরুৎকারু-ঋষি-দয়িতা'। এই ঋষির ঔরসে তাঁর গর্ভে জন্মলাভ করেছিলেন আস্তিক নামক পুত্র। তাই তিনি আস্তিক জননী।
  • গানটির শেষে দেবীর কাছে ভক্তের প্রার্থনা উপস্থাপিত হয়েছে। কবি তাঁকে আক্ষরিক এবং রূপকার্থে বিষহরী নামে অভিহিতা করেছেন। পুরাণ মতে- তপস্যার দ্বারা সকল বিষকে তিনি নির্বিষ করতে পারতেন বলে তিনি বিষহরি নামপ্রাপ্তা হয়েছিলেন।  কবি তাঁর এই অর্থের বাইরে ভিন্নার্থে শব্দটিকে ব্যবহার করেছেন। এখানে বিষহরীর, বিষ হলো- মানুষের দেহ ও মনের 'পাপ-বিষ'।  এখানে দেবীর কাছে ভক্তের দেহ ও মনের পাপ-বিষ হরণ করার জন্য প্রার্থনা করেছেন।

    তিনি স্বর্গ-মর্ত্-পাতাল এবং ব্রহ্মলোকাদিতে মনোহরা সুন্দরী এবং গৌরী বলে জগৎ গৌরী নামে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। তাঁর গাত্রবর্ণকে ধুতুরা-বর্ণা বলা হয়েছে। অন্য অর্থে শিবের প্রিয় ফুল হলো ধুতুরা। শিবের যোগ্যা শিষ্যা হিসেবে রূপকার্থে তাঁকে বলা হয়েছে  ধুতুরা-বর্ণা। গানটির শেষে কবি তাঁর কাছে কবি প্রাথনা করেছেন 'হে যোগী ও মুনিদের দ্বারা সেবিতা দেবী মনসা, আপনি প্রসন্ন হোন"। এখানে গানটি হয়ে উঠেছে- বন্দনা ও প্রার্থনা।

  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৮৯৩। পৃষ্ঠা: ৫৭০]
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দু ধর্ম। মনসা দেবী। বন্দনা ও প্রার্থনা।

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।