জল ফেলে জল আনতে গেলি (jol fele jol ante geli)

জল ফেলে জল আনতে গেলি, ওলো কুলের রাধা।
ছল করে তুই নামলি ঘাটে ভাঙতে কুলের বাধা॥
কদমতলায় রাখাল চেলে বাজায় বসে বাঁশি,
তাই শুনে তুই আসলি ছুটে ওলো সর্বনাশী।
ঘরের বাঁধন সইল না তোর, রইলি না তাই বাঁধা॥
জটিলা শাশুড়ি রে তোর কুটিলা ননদী,
শাস্তি তোরেদেবে কঠিন, জানতে পারে যদি।
নন্দের নন্দন ওকালা, মানে নাকো মানা,
কত বধূর কুল ভাঙালো নেই কো যে অজানা।
ঐ বাঁশির সুরে যাদু আছে, শেষে সার হবে তোর কাঁদা॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানটিতে রাধার ভক্তিপ্রেম, কৃষ্ণের মোহনীয় রূপ ও বাঁশির মোহনীয় সুর এবং সংসারের বিধিনিষেধের মধ্যে তাঁদের ঐশ্বরিক মিলনের রূপাঙ্কিত চিত্র তুলে ধরে।

    এই গানের শুরতে রাধাকে প্রশ্ন করা হয়েছে- সে কেন জল আনার ছুতো করে কলসির জল ফেলে দিয়ে আবার জল আনতে ঘাটে এলো। কিন্তু এটা কি নিতান্তই জল আনা, না কি নাকি কৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করার ছল। কুলের (সমাজের, পরিবারের) বাধা ভাঙার এ ছলই বা কেন? মূলত রাধা এখানে প্রতীকী ভাবে ভক্তের প্রতিনিধিত্ব করেন, যিনি সংসারের বাধা উপেক্ষা করে ঈশ্বরের (কৃষ্ণের) কাছে যেতে চান। জল আনা একটি অজুহাত, আসল উদ্দেশ্য কৃষ্ণের সান্নিধ্য।

    কদম গাছের তলায় সেই রাখাল ছেলে (কৃষ্ণ) বাঁশি বাজাচ্ছে। এ কথা জানে রাধা। তবু তার বাঁশির সুর শুনে সেখানেই ছুটে যায় সে, সংসারে সর্বনাশ করা জন্য সর্বনাশী হয়ে। ঘরের বাঁধন তথা পরিবার ও সমাজের নিয়ম তার কাছে এতই অসহনীয় হয়ে উঠেছে, যে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। এখানে কৃষ্ণের বাঁশি ঐশ্বরিক ডাকের প্রতীক, যে আহ্বান শুনে রাধার মতো ভক্ত নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। তাই  এই ডাক শুনে সব বাধা ভুলে রা]ধার মতো ছুটে যায়। 

    সংসারে রয়েছে তার শাশুড়ি জটিলা আর কুটিলা ননদ। যদি তারা কৃষ্ণের সঙ্গে সাথে তাঁর মেলামেশার কথা জানতে পারে, তবে কঠিন শাস্তি দেবে। এখানে জটিলা ও ননদী সংসারের কঠোর নিয়ম-কানুনের প্রতীক, যারা ভক্তের ঈশ্বর-প্রেমের পথে বাধা দেয়। এটি সমাজের বিধিনিষেধ ও ভক্তির মধ্যে দ্বন্দ্বের চিত্রকে উপস্থাপন করে।

    নন্দের পুত্র (কৃষ্ণ), সেই দুষ্টু ছেলে, কোনো নিয়ম মানে না। কত গোপিনীদের কুল-মর্যাদা ভেঙেছে, এটা কেউ জানে না এমন নয়। তাঁর বাঁশির সুরে যাদু আছে, শেষ পর্যন্ত তার কান্নাই সার হবে।  কৃষ্ণের দুষ্টুমি ও মোহনীয় রূপ সকলেরই জানা। তাঁর বাঁশির যাদুতে রাধা ও গোপিনীরা সংসারের বাধা ভুলে যায়। এটি ঐশ্বরিক প্রেমের মাধ্যমে মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেয়।

    সব মিলিয়ে এই গান রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের মাধুর্য ও ভক্তির গভীরতা তুলে ধরে। রাধার জল আনার ছল, বাঁশির টানে ছুটে যাওয়া, সমাজের বাধা—সবই রূপক। রাধা হলেন ভক্তের প্রতীক, কৃষ্ণ ঈশ্বর, আর বাঁশি ঐশ্বরিক ডাক। গানটি বলছে, ঈশ্বরের প্রেমে সংসারের বাধা তুচ্ছ; শেষ পর্যন্ত এই প্রেমই মুক্তি দেবে। এটি ভক্তিরস এক অপূর্ব মিশ্রণ।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:   গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু যায় নি। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের  ২৭ ফেব্রুয়ারি (বৃ্হস্পতিবার ১৪ ফাল্গুন ১৩৪২), জগৎঘটকের রচিত জীবনস্রোত গীতি-আলেখ্য, কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়। এই নাটকে এ গানটি প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৬ বৎসর ৭ মাস।
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২)। ২৯৯৬ সংখ্যক গান।
  • বেতার:  জীবনস্রোত [গীতি-আলেখ্য।  রচনা জগৎঘটক। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬। ১৪ ফাল্গুন ১৩৪২। সান্ধ্য অনুষ্ঠান: ৮.৩০-৯.১৪ মিনিট
    • সূত্র:
      • বেতার জগৎ। সপ্তম বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা। ১৬ ফেব্রুয়ারি. ১৯৩৬। পৃষ্ঠা ১৭২
      • The Inidian Listener font size.4.Vol I No 4, Page 232
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। প্রণয়। রাধা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।