জাগো জাগো, রে মুসাফির (jago jago, re musafir)
জাগো জাগো, রে মুসাফির হ'য়ে আসে নিশিভোর।
ডাকে সুদূর পথের বাঁশি ছাড় মুসাফির-খানা তোর॥
অস্ত-আকাশ-অলিন্দে ঐ পাণ্ডুর কপোল রাখি'
কাঁদে মলিন ভোরের শশী, বিদায় দাও বন্ধু চকোর॥
মরুচারী খুঁজিস সলিল অগ্নিগিরির কাছে, হায়!
খুঁজিস্ অমর ভালোবাসা এই ধরণীর এই ধূলায়।
দারুণ রোদের দাহে খুঁজিস কুঞ্জ-ছায়া স্বপ্ন-ঘোর॥
- ভাবসন্ধান: সুফিবাদী দর্শনের আলোকে রচিত গজলাঙ্গের এই গানে- জীবনের যাত্রাপথ শেষে নবতর যাত্রার আহবান উপস্থাপিত হয়েছে। এ গানের এখানে মুসাফির হলে চলমান জীবনপথের যাত্রী। এ মুসাফির অবিরাম চলার পথে ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম চায়। কিন্তু সময়ের শ্রোতধারায় আবার আসে চলার আহ্বান। গানটি এই আহ্বান ও জাগরণের, যাত্রা অব্যাহত রাখার, এবং জীবনের অনিত্যতা ও অমর প্রেমের সন্ধানের। এতে বৈরাগ্য, আধ্যাত্মিকতা, জীবন-মৃত্যুর দর্শন এবং অমর ভালোবাসার অন্বেষণ মিলেমিশে একাকার।
তিনটি অন্তরায় বিন্যস্ত গানটির প্রথম অন্তরাতে রাত্রি শেষে মুসফিরকে নতুন যাত্রাপথে যাওয়ার আহবান করা হয়েছে। মুসাফির জীবন পথের পথিক। তাই থেমে থাকার অবসর নেই দূরের পথের আহ্বান (বাঁশির সুর) তাকে টানছে। এখানে মুসাফিরখানা হলো পার্থিব সুখ-আরামের আশ্রয়।
দ্বিতীয় অন্তরাতে মুসাফিরের বিদায়ের বেদনা উপস্থাপন করা হয়েছে নানা রূপকতায়। এখানে ভোরের চাঁদ (শশী) বিদায়ের বেদনায় কাঁদছে। চকোর (চাঁদের প্রেমিক পাখি) যে চাঁদের সঙ্গ ছাড়তে চায় না, তাকেও বিদায় দিতে হবে। এটি জীবনের অনিত্যতা ও বিচ্ছেদের প্রতীক- যা পুরনো রাত্রির সঙ্গীদের ছেড়ে নতুন যাত্রার বেদনাকে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তৃতীয় অন্তরাতে মুসাফিরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে- প্রতিটি মানুষ তৃষ্ণার্ত মরুচারী। দিকভ্রান্ত, লক্ষ্যভ্রান্ত হয়ে সে জল চায় আগ্নেয়গিরির কাছে। সে অমর প্রেম চিরন্তা শান্তি খুঁজে ফেরে এই ক্ষণস্থায়ী ধুলো মাটির পৃথিবীতে। অশান্তির রৌদ্র তপ্ত চলার পথে সে খোঁজে প্রশান্তির ছায়া-কুঞ্জ স্বপ্নের ঘোরে। এ যেন অসম্ভব জীবন মায়ায় অসম্ভবের পিছনে ছোটা। সত্যিকারের অমর প্রশান্তি এখানে পাওয়া যায় না- এটাই মুসাফিরের করুণ বাস্তবতা।
গানটিতে মর্মবাণীতে রয়েছে- ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবন মানুষ মাত্রেই যে মুসাফির, তাই স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। মুসাফিরের অবিরাম যাত্রাপথে বিশ্রামের নেশায় কখনো থেমে যায়। এরই ভিতরে অমর ভালোবাসা, শান্তি বা পরম সত্য খুঁজতে গিয়েমুসাফির অসম্ভবের পিছনে ছোটে, কিন্তু সবই ক্ষণস্থায়ী। এই গানের একদিকে রয়েছে বৈরাগ্যের সুর, অন্যদিকে রয়েছে যাত্রার আহ্বান এবং অমর প্রেমের অন্বেষণের প্রত্যাশা। জীবনের অনিত্যতা, মায়াময় জগৎ এবং আধ্যাত্মিক জাগরণের সংমিশ্রণে সৃষ্ট দর্শন মহিমান্বিত আগাবেগে উপস্থাপিত হয়েছে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪০) মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি গানটি প্রথম রেকর্ড করে। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ৩ মাস।
- গ্রন্থ:
- গীতি-শতদল
- প্রথম সংস্করণ [বৈশাখ ১৩৪১। এপ্রিল ১৯৩৪। ভৈরবী-কাহারবা]।
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংকলন। পঞ্চম খণ্ড। বাংলা একাডেমী। ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১। গীতি-শতদল। গান সংখ্যা ৪৩। ভৈরবী-কাহারবা। পৃষ্ঠা ৩০৬]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ২১৭৮। রাগ: ভৈরবী, তাল: কাহারবা । পৃষ্ঠা: ৬৫৫]
- গীতি-শতদল
- রেকর্ডর: এইএমভি [সেপ্টেম্বর ১৯৩৩ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪০)]। এন ৭১৪১। শিল্পী: মাস্টার সুনীল।
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
- জগৎঘটক। সুরলিপি। প্রকাশক: কাজী নজরুল ইসলাম [নমুনা]
- সেলিনা হোসেন। [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, বায়ান্নতম খণ্ড, কবি নজরুল ইন্সটিটিউট, আষাঢ় ১৪২৭। জুন ২০২১] রেকর্ডে মাস্টার সুনীলের গাওয়া গানের সুরানুসারে স্বরলিপি করা হয়েছে। গান সংখ্যা ১৫। পৃষ্ঠা: ৬৭-৭০ [নমুনা]
- পর্যায়: