ঝাঁপিয়া অঞ্চলে কেন বিধুবদন অবনত কাছে (jhanpiya onchole keno bidhubodon obonoto kachhe)
ঝাঁপিয়া অঞ্চলে কেন বিধুবদন অবনত কাছে নয়ান।
অভিমান পরিহর হরি-হৃদি বিহারিণী প্রেম দিয়া জুড়াও এ প্রাণ।
তুয়া বিনা নয়নে অন্যে না হেরি
একই রাধা আছে ত্রিভুবন ঘেরি’
(আমি রাধা ছাড়া জানি’ না১
অনন্ত বিশ্বে রাধারই রূপধারা,
রাধা ছাড়া দেখি না)
ভৃঙ্গার ভরি’ তুমি শৃঙ্গার রস
করাও পান, তাই হই যে অবশ॥
রাধা হয়ে মধু দিলে মাধব হই,
তুমি ধারা হয়ে নামিলে সৃষ্টিতে রই
রাধা, সকলি তোমার খেলা
তবে কেন কর অভিমান, কেন কর হেলঅ।
প্রতি দেহ-বিম্বে তোরি
পদতলে হর হয়ে রহি তাই ছবি।
হরিরত হর-জ্ঞান মহামায়া হরিলী
(এ যে) তোমারই ইচ্ছা, আমি নিজে নিজে রূপ ধরিণী।
ভোল মানের খেলা
দূরে থেকোনা, দাও চরণ ভেলা
আমি তরে’ যাই, তরে’ যাই
রাধা-প্রেম-যমুনায় ডুবিয়া মরে’ যাই॥
পাঠান্তর : রেকর্ডের জন্য কবি এই গানটির বহু অংশ বর্জন করেন। বর্জিত অংশগুলো এই :
গলে দিয়া পীতধড়া গো, পদতলে দিয়া শিখী-চূড়া গো
পদযুগ ধরিয়া চাহি ক্ষমা, ক্ষম অপরাধ প্রিয়তমা।
হরি-মনোরমা ক্ষমা কর গো॥
তব প্রেমে অবগাহন করি সব দাহন চিরতরে জুড়াব
কল্প-কদম-তরু-তলে চিরদিন তোমার প্রেম-কণা কেশর কুড়াব॥
- ভাবসন্ধান: কীর্তনাঙ্গের এই গানে, উপস্থাপন করা হয়েছে- রাধার প্রতি কৃষ্ণের একান্ত অনুরক্ততা এবং শ্রীকৃষ্ণের প্রেমলীলার গভীর আধ্যাত্মিক দর্শন। এ গানের রাধার অভিমান এবং কৃষ্ণের অনুরাগ এবং রাধা-তত্ত্বের দার্শনিক রূপ উদ্ভাসিত হয়েছে প্রেম ও ভক্তিরসের যুগল অনুভবে।
রাধাকৃষ্ণের লীলায় অভিমানিনী বিনত রাধার সুন্দর চন্দ্রবদন দেখে- কৃষ্ণ তাঁর মান ভাঙনোর জন্য- নিজেকে সম্পূর্ণ রাধার কাছে সমর্পণ করে বলছেন- 'হে হরি-হৃদয়-বিহারিণী, তোমার প্রেম দিয়ে আমার প্রাণকে শান্ত করো। তোমাকে ছাড়া আমার চোখ অন্য কাউকে দেখতে চায় না'।
রাধা ছাড়া কৃষ্ণ তাঁর অনুভব করেছেন তাঁর অসহায়ত্ব। তিনি অনুভব করেছেন তাঁর জন্য সমগ্র ত্রিভুবনে একমাত্র রাধাই আছেন- তাঁর অগণন রূপবিহারে, অসীম সৌন্দর্যে। তাই কৃষ্ণের মনে করেন বিশ্বজগতে যতর অনুপম সৌন্দর্য রয়েছে, তা মূলত রাধারই রূপান্তর।
তাঁর কাছে রাধাই একমাত্র প্রেম ও শৃঙ্গার-রসের আধার। আর তিনি প্রেমের ভাণ্ডার পূর্ণ করে কৃষ্ণকে সেই প্রেমরস পান করান। সেই প্রেমের মাধুর্যে কৃষ্ণ নিজেও মুগ্ধ ও বিবশিত হয়ে যান। এরপর ভাবের স্তর আরও গভীর হয়, যখন কৃষ্ণ বলেন- রাধা হয়ে যদি তুমি মধু দাও, তবে আমি মাধব হয়ে উঠি। অর্থাৎ রাধার প্রেমেই কৃষ্ণের পরমসত্তা পূর্ণতা পায়। যদি সৃষ্টিতে বর্ষণধারা হয়ে রাধা যদি নেমে আসেন, তবে সেই সৃষ্টির মধ্যেই কৃষ্ণ অবস্থান করেন। কৃষ্ণ বলেন আসলে সবই রাধারই লীলা। কৃষ্ণ বুঝতে পারেন না- তবে কেন এই মান-অভিমান, কেন এই দূরত্ব? প্রতিটি জীবে, প্রতিটি সত্তায় কৃষ্ণ রাধার প্রতিফলন দেখেন। তাই কৃষ্ণ তাঁর পদতলে তাঁরই প্রতিচ্ছবি হয়ে বিরাজ করেন। রাধার মহামায়া কৃষ্ণের জ্ঞানকেও আচ্ছন্ন করে রাখে। কৃষ্ণ মনে করেন সবই রাধার ইচ্ছা, সবই তাঁর নানা রূপের প্রকাশ মাত্র।
শেষে কৃষ্ণ রাধাকে এই মান-অভিমানের খেলা শেষ করো কাছে আসার অনুরোধ করেন। তিনি প্রেম সাগরে ভাসার জন্য রাধার চরণের ভেলা প্রার্থনা করেছেন- যাতে সেই ভেলায় ভর করে প্রেমের সাগর পার হতে পারেন কৃষ্ণ। তাঁর প্রেমরূপী যমুনায় ডুবে গিয়ে- আত্মবিসর্জন দেওয়ার মধ্যেই রয়েছে তাঁর প্রেমের পরমানন্দ।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই নভেম্বর (শনিবার, ২৩ কার্তিক ১৩৪৭), কলকাতা বেতারকেন্দ্র থেকে অভিমানিনী প্রথম প্রচারিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪১ বৎসর ৫ মাস।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৯০২। পৃষ্ঠা: ৫৭৩-৫৭৪]
- বেতার:
- রেকর্ড:
- এইচএমভি [জুলাই ১৯৪১ (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৪৮)। এন ২৭১৫২। শিল্পী: মৃণালকান্তি ঘোষ। সুর চিত্তরায়। শ্রেণি: কীর্তন]
রেকর্ডে এই গানের বেশকিছু অংশ বর্জন করা হয়েছে।
- এইচএমভি [জুলাই ১৯৪১ (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৪৮)। এন ২৭১৫২। শিল্পী: মৃণালকান্তি ঘোষ। সুর চিত্তরায়। শ্রেণি: কীর্তন]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: সেলিনা হোসেন [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, তেতাল্লিশতম খণ্ড, আষাঢ় ১৪২৫] গান সংখ্যা ৬। পৃষ্ঠা: ৩৫-৩৭ [নমুনা]
- পর্যায়: