তুই কালি মেখে জ্যোতি ঢেকে (tui kali mekhe jyoti dheke)

তুই কালি মেখে জ্যোতি ঢেকে পারবি না মা ফাঁকি দিতে।
ঐ অসীম আঁধার হয় যে উজল মা, মো তার ঈষৎ চাহনিতে॥
মায়ের কালি মাখা কোলে
শিশু কি মা, যেতে ভোলে?
আমি দেখেছি যে, বিপুল স্নেহের সাগর দোলে তোর আঁখিতে॥
কেনআমায় দেখাস মা ভয় খড়গ নিয়ে, মুণ্ডু নিয়ে?
আমি কি তোর সেই সন্তান ভুলাবি মা ভয় দেখিয়ে।
তোর সংসার কাজে শ্যামা,
বাধা আমি হব না মা,
মায়ার বাঁধন খুলে দে মা ব্রহ্মময়ী রূপ দেখিতে॥

  • ভাবসন্ধান: উপস্থাপিত শ্যামাসঙ্গীতটি কাজী নজরুল ইসলাম-এর ভক্তিমূলক সৃষ্টির এক অনন্য নিদর্শন, যেখানে ভক্ত ও মাতৃরূপিণী দেবীর সম্পর্ক নিছক ভয়ের নয়, বরং গভীর স্নেহ, অন্তরঙ্গতা ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এখানে ভক্তের কণ্ঠে যেমন অটল বিশ্বাস, তেমনি রয়েছে এক নিবিড় আবদার ও অধিকারবোধ।

    গানের সূচনায় ভক্ত মা-কে উদ্দেশ করে বলেন—“কালি মেখে জ্যোতি ঢেকে পারবি না মা ফাঁকি দিতে।” এই পংক্তিতে এক গভীর দার্শনিক সত্য নিহিত। মা কালীর অন্ধকারবর্ণ কোনো আড়াল নয়; বরং সেই অন্ধকারের মধ্যেই চূড়ান্ত জ্যোতির প্রকাশ। অর্থাৎ, এখানে অন্ধকার ও আলোর এক অপূর্ব ঐক্য প্রতিফলিত হয়েছে। ভক্তের দৃষ্টিতে মায়ের “ঈষৎ চাহনি”ই অসীম আঁধারকে উজ্জ্বল করে তুলতে সক্ষম—এটি তাঁর সর্বব্যাপী শক্তি ও করুণারই প্রতীক।

    পরবর্তী অংশে ভক্ত মায়ের ভয়ংকর রূপ—খড়্গ ও মুণ্ডমালার প্রসঙ্গ উত্থাপন করে প্রশ্ন তোলেন। সাধারণ মানুষের কাছে এই রূপ ভীতিজনক হলেও, সন্তানের কাছে মা চিরস্নেহময়ী। “মায়ের কালি মাখা কোলে / শিশু কি মা, যেতে ভোলে?”—এই পংক্তিতে ভক্তের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ও ভালোবাসা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে ভক্ত যেন প্রতিবাদী সুরে জানিয়ে দেয়, বাহ্যিক ভয়ের আবরণ তাকে মায়ের সান্নিধ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। বরং মায়ের চোখে সে দেখে “বিপুল স্নেহের সাগর”—যা তাঁর প্রকৃত স্বরূপ।

    উল্লেখ্য, এ গানের খড়্গ ও মুণ্ডমালার প্রতীকী অর্থও গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো ধ্বংসের চিহ্ন নয়, বরং অজ্ঞানতা, অহংকার ও মায়াবন্ধন ছিন্ন করার শক্তির প্রতীক। মা এখানে ভয়ংকরী নন, বরং মুক্তিদাত্রী।

    গানের শেষাংশে ভক্তের আকাঙ্ক্ষা এক উচ্চতর আধ্যাত্মিক স্তরে উন্নীত হয়। “মায়ার বাঁধন খুলে দে মা ব্রহ্মময়ী রূপ দেখিতে”—এই প্রার্থনায় ভক্ত সগুণ রূপের আরাধনা থেকে নির্গুণ ব্রহ্মের উপলব্ধির দিকে অগ্রসর হতে চায়। সে বুঝতে পারে, মা-ই জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের আদিশক্তি। তাই তাঁর কাছে ভক্তের আর্তি—সংসারের বন্ধন ছিন্ন করে সেই সর্বব্যাপী, ব্রহ্মময় রূপের দর্শন লাভ করা।

    সবশেষে বলা যায়, এই শ্যামাসঙ্গীতটি ভক্তির এক পূর্ণাঙ্গ রূপচিত্র, যেখানে ভয়, স্নেহ, অধিকারবোধ ও আধ্যাত্মিক সাধনা একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। ভক্ত এখানে ভীত নয়, বরং জ্ঞান ও প্রেমে পরিপূর্ণ এক সন্তানের মতো মায়ের সান্নিধ্যে পৌঁছাতে চায়—এটাই গানটির মূল সুর ও সৌন্দর্য।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৫০) মাসে কলম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি এই গানের একটি রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪৪ বৎসর ৭ মাস।
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৯০৯। পৃষ্ঠা: ৫৭৬]
  • রেকর্ড: কলম্বিয়া [সেপ্টেম্বর ১৯৪৩ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৫০)। জিই ২৬০৫। শিল্পী: উত্তরা দেবী। সুর নিতাই ঘটক]
     
  • স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
  •  সুরকার: নিতাই ঘটক
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ:  সনাতন হিন্দুধর্ম, শাক্ত। কালী। বন্দনা
    • সুরাঙ্গ: রাগাশ্রয়ী
    • রাগ: ইমন কল্যাণ
    • তাল: দাদরা
    • গ্রহস্বর: রগা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।