তুই পাষাণ গিরি মেয়ে হ’লি (tui pashan giri meye holi)

তুই পাষাণ গিরি মেয়ে হ’লি পাষাণ ভালোবাসিস্‌ ব’লে।
মা গ’রবে কি তোর পাষাণ-হৃদয় তপ্ত আমার নয়ন-জলে॥
তুই বইয়ে নদী পিতার চোখে
লুকিয়ে বেড়াস লোকে লোকে
মহেশ্বরও পায় না তোকে প’ড়ে মা তোর চরণতলে॥
কোটি ভক্ত যোগী ঋষি ঠাঁই পেল না তোর চরণে,
তাই ব্যথায়-রাঙা তা’দের হৃদয় জবা হ’য়ে ফোটে বনে।
আমি শুনেছি মা ভক্তি ভরে
মা ব’লে ডাকে তোরে
(তুই) অমনি গ’লে অশ্রু-লোরে ঠাঁই দিস তোর অভয় কোলে॥

  • ভাবসন্ধান: ভক্তি সাহিত্যের এক গভীর ও হৃদয়স্পর্শী রূপচিত্র, যেখানে ঈশ্বর ও ভক্তের সম্পর্ককে মা ও সন্তানের চিরন্তন বন্ধনে রূপায়িত করা হয়েছে। অভিমান, আকুলতা, তপস্যা ও করুণার মধ্য দিয়ে ভক্ত শেষ পর্যন্ত উপলব্ধি করে—দেবী কেবল অলভ্য মহাশক্তি নন, তিনি সন্তানের ডাকে সাড়া দেওয়া এক চিরস্নেহময়ী জননীরূপিণী হয়ে।

    গানের সূচনায় ভক্ত দেবীকে 'পাষাণ গিরির মেয়ে' বলে সম্বোধন করে তাঁকে ‘পাষাণ হৃদয়’ বলে অভিহিত করেন। “পাষাণ” শব্দটি এখানে দ্ব্যর্থবোধক। এই সম্বোধনে একদিকে যেমন হিমালয়-কন্যা পার্বতীর পরিচয় নিহিত, তেমনি অন্যদিকে রয়েছে দেবীর নির্বিকার, অনাসক্ত মহাশক্তির ইঙ্গিত। ভক্তের এই উক্তি নিছক অভিযোগ নয়; এটি এক মধুর অভিমান, যেখানে সন্তানের ভালোবাসা ও দাবি মিলেমিশে একাকার হয়েছে। “তপ্ত আমার নয়ন-জলে”—এই পংক্তিতে ভক্ত তাঁর অশ্রুকেই শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। এখানে অশ্রু কেবল আবেগ নয়, বরং তপস্যারই এক রূপ—যা দেবীর কঠোর হৃদয়কেও গলিয়ে দিতে সক্ষম।

    পরবর্তী অংশে “তুই বইয়ে নদী পিতার চোখে / লুকিয়ে বেড়াস লোকে লোকে”—এই চিত্রকল্পে দেবীর লীলাময় ও অলভ্য স্বরূপ ফুটে উঠেছে। তিনি সর্বত্র বিরাজমান—নদীর স্রোতে, প্রকৃতির বুকে—তবুও সহজে ধরা দেন না। এমনকি “মহেশ্বরও পায় না তোকে”—এই উক্তিতে ভক্ত এক কাব্যিক অতিশয়োক্তির মাধ্যমে দেবীর দুর্লভতাকে চরম পর্যায়ে উন্নীত করেছেন। বাস্তবে শিব ও শক্তি অবিচ্ছেদ্য হলেও, ভক্তের অভিমানে দেবী যেন এতটাই অধরা যে স্বয়ং মহেশ্বরও তাঁকে সর্বদা লাভ করতে পারেন না।

    গানের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হলো জবা ফুলের রূপক ব্যাখ্যা। “কোটি ভক্ত যোগী ঋষি ঠাঁই পেল না তোর চরণে / তাই ব্যথায়-রাঙা তা’দের হৃদয় জবা হ’য়ে ফোটে বনে”—এই পংক্তিতে কবি এক অনন্য কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন। এখানে জবা ফুল কেবল একটি পুষ্প নয়; এটি অসংখ্য সাধক-ভক্তের ব্যর্থ সাধনা, বেদনা ও গভীর অনুরাগের প্রতীক। শাক্ত উপাসনায় জবা ফুলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, ফলে এই রূপকটি আধ্যাত্মিক ও উপাসনামূলক উভয় দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ।

    গানের শেষাংশে এসে সমস্ত ভক্তের অভিমান এবং ভক্তির সরলতা ও করুণাকে উপস্থাপন করে। ভক্ত শুনেছেন, কেউ যদি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও আন্তরিকতায় ‘মা’ বলে ডাক দেয়, তবে দেবী আর স্থির থাকতে পারেন না। 'অমনি গ’লে অশ্রু-লোরে ঠাঁই দিস তোর অভয় কোলে'—এই পংক্তিতে দেবীর চূড়ান্ত মমতাময় রূপ প্রকাশ পেয়েছে। এখানে ভক্তির পথ জটিল সাধনা বা শাস্ত্রীয় জ্ঞানের নয়; বরং শিশুসুলভ আহ্বান, অশ্রুসিক্ত ব্যাকুলতা এবং নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়েই দেবীকে লাভ করা সম্ভব।
     

  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।  ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি (মাঘ-ফাল্গুন ১৩৪৪) মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ৮ মাস।
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২)। ১৯১০ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৫৭৬।
  • রেকর্ড: এইচএমভি  [ফেব্রুয়ারি ১৯৩৮ (মাঘ-ফাল্গুন ১৩৪৪)। এন ১৭০৪১। শিল্পী: শৈলেন গাঙ্গুলী। সুর: কমল দাশগুপ্ত]
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দু ধর্ম। শাক্ত।

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।