তুই বলহীনের বোঝা রহিস্‌ যেথায় ভৃত্য (tui bolohiner bojha bohish jethay vrityo hoye)

তুই বলহীনের বোঝা রহিস্‌ যেথায় ভৃত্য হ’য়ে।
যথা, দাসী হয়ে করিস্‌ সেবা, যা মা সেথায় ল’য়ে
(মোরে) যা মা সেথায় ল’য়ে।
(যথা) দুঃখী পিতার সাথে কাঁদিস উপবাসী র’য়ে
(মোরে) যা না সেথায় ল’য়ে॥
শ্রমিক, চাষার তরে যথা আঁধার খাদে মাঠে।
ক্ষুধার অন্ন নিস্‌ মা ব’য়ে নে মা তাদের হাটে
(মোরে) নে মা তাদের হাটে॥
তুই, ত্রিজগতের পাপ কুড়ালি
(তাই) সোনার অঙ্গ হ’ল কালি
তোরে সেই কালোতে পাব মহাকালীর পরিচয়ে॥

  • ভাবসন্ধান: উপস্থাপিত শ্যামাসঙ্গীতটি কাজী নজরুল ইসলাম-এর ভক্তিমূলক সৃষ্টির এক অসাধারণ নিদর্শন, যেখানে আধ্যাত্মিকতা ও মানবিকতার এক অনন্য সমন্বয় ঘটেছে। এখানে দেবী কেবল পূজার অর্চনীয় প্রতিমা নন, বরং তিনি দুঃখী, বঞ্চিত ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনের অন্তরঙ্গ অংশ। এই গানে ভক্তির পথ রূপান্তরিত হয়েছে মানবসেবা ও কর্মযোগের এক উচ্চতর আদর্শে।

    গানের সূচনায় ভক্ত মা-কে আহ্বান জানিয়ে বলেন' বলহীনের বোঝা রহিস্‌ যেথায় ভৃত্য হয়ে' এই পংক্তিতে দেবীর এক অভিনব ও বৈপ্লবিক রূপ উন্মোচিত হয়েছে। তিনি এখানে প্রভু নন, বরং সেবক; শক্তির আধার হয়েও তিনি দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের ভার বহন করেন। ভক্ত নিজেও সেই পথের সহযাত্রী হতে চায়- 'মোরে যা মা সেথায় ল'য়ে'-এই আকাঙ্ক্ষায় ভক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেবার অঙ্গীকার।

    পরবর্তী অংশে 'দাসী হয়ে করিস্‌ সেবা' এবং 'দুঃখী পিতার সাথে কাঁদিস উপবাসী র'য়ে'- এই চিত্রকল্পে দেবীর করুণাময় রূপ পূর্ণতায় প্রকাশ পেয়েছে। তিনি দূরবর্তী অলৌকিক সত্তা নন; বরং মানুষের দুঃখে-দুর্দশায় নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। মানুষের অশ্রু, বেদনা ও অভাব তাঁর নিজের অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। এইভাবে ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে এক গভীর সহমর্মিতার সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। 'শ্রমিক, চাষার তরে যথা আঁধার খাদে মাঠে'- এই পংক্তিতে সমাজের অবহেলিত, পরিশ্রমী মানুষের কঠোর বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। দেবী তাঁদের জন্য অন্ন বহন করেন, তাঁদের সংগ্রামে সহায়তা করেন। এর মাধ্যমে কবি দেখিয়েছেন, ঈশ্বরের প্রকৃত অবস্থান মন্দিরের অলংকারে নয়, বরং শ্রমিকের ঘাম ও কৃষকের মাটির সঙ্গে মিশে আছে। ভক্তও সেই বাস্তব জীবনের মধ্যেই ঈশ্বরকে খুঁজে পেতে আগ্রহী।

    গানের শেষাংশে 'ত্রিজগতের পাপ কুড়ালি / তাই সোনার অঙ্গ হ’ল কালি'- এই পংক্তিতে দেবীর কালো রূপের এক গভীর তাৎপর্য উন্মোচিত হয়েছে। তাঁর এই কালো বর্ণ কোনো অশুভতার প্রতীক নয়; বরং জগতের সমস্ত পাপ, দুঃখ ও অশুচিতা নিজের মধ্যে ধারণ করার ফল। এই ত্যাগ ও করুণার কারণেই তিনি 'কালী'। 'সেই কালোতে পাব মহাকালীর পরিচয়ে'- এই উপলব্ধির মাধ্যমে ভক্ত বুঝতে পারে, দেবীর প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে হলে জীবনের অন্ধকার, দুঃখ ও সংগ্রামের মধ্যেই তাঁকে খুঁজতে হবে।

    সবশেষে বলা যায়, এই শ্যামাসঙ্গীতটি ভক্তির এক মানবমুখী দর্শন প্রতিষ্ঠা করে, যেখানে ঈশ্বরসাধনা মানে কেবল আচার-অনুষ্ঠান নয়, বরং মানুষের সেবা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের মধ্য দিয়ে ঈশ্বরকে উপলব্ধি করা। এখানে 'জীবসেবা-ই ঈশ্বরসেবা' এই চিরন্তন বাণীই গানের মূল সুর হিসেবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। 
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৯১১ গান। তাল: দাদরা। পৃষ্ঠা: ৫৭৬।
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। কালী। প্রর্থনা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।