তুমি অনেক দিলে খোদা, দিলে অশেষ নিয়ামত (tumi onek dile khoda, dile oshesh niyamot)
তুমি অনেক দিলে খোদা, দিলে অশেষ নিয়ামত —
আমি লোভী, তাইতো আমার মেটে না হসরত॥
কেবলি পাপ করি আমি — মাফ করিতে তাই, হে স্বামী,
দয়া করে শ্রেষ্ঠ নবীর করিল উম্মত।
তুমি নানান ছলে করছ পূরণ ক্ষতির খেসারত॥
মায়ের বুকে স্তন্য দিলে, পিতার দিলে স্নেহ;
মাঠে শস্য ফসল দিলে আরাম লাগি গেহ।
ঈদের চাঁদের রঙ মশালে রঙিন বেহেশ্ত্ পথ দেখালে
আখেরেরই সহায় দিলে আখেরি হজরত।
তুমি আজান দিলে না ভুলিতে মসজিদেরই পথ॥
- ভাবসন্ধান: আধ্যাত্মিক কৃতজ্ঞতা, মানবিক সীমাবদ্ধতা এবং স্রষ্টার অসীম করুণার এক গভীর অনুভব উপস্থাপিত হয়েছে এই গানে। এখানে ভক্তের অন্তর থেকে উৎসারিত হয়েছে তওবা, অনুশোচনা ও নিয়ামতের স্বীকৃতি- যা মিলিত হয়ে এক অনন্য ভক্তিভাবের সৃষ্টি করেছে।
গানের সূচনায় ভক্ত স্বীকার করেন যে, আল্লাহ তাঁকে অগণিত নেয়ামত দান করেছেন, তবুও মানুষের স্বভাবজাত প্রবণতা হলো অতৃপ্তি ও আকাঙ্ক্ষা। 'আমি লোভী, তাইতো আমার মেটে না হজরত'- এই পংক্তিতে মানব হৃদয়ের সীমাহীন চাওয়া ও আত্মিক অপূর্ণতা প্রকাশ পেয়েছে। এখানে স্পষ্ট হয় যে, পার্থিব প্রাচুর্যেও মানুষের অন্তর পূর্ণতা পায় না; প্রকৃত তৃপ্তি কেবল স্রষ্টার সান্নিধ্যেই নিহিত।
পরবর্তী অংশে ভক্ত নিজের পাপ ও দুর্বলতা অকপটে স্বীকার করে বলা হয়েছে- 'কেবলি পাপ করি আমি'। এই স্বীকারোক্তিই তওবার মূল ভিত্তি, যার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর রহমতের দিকে প্রত্যাবর্তন করে। ভক্ত আরও উপলব্ধি করেন যে, স্রষ্টা তাঁর অসীম করুণায় মানুষকে সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর উম্মত হওয়ার সৌভাগ্য দান করেছেন। এই প্রসঙ্গে মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে মানবজাতির প্রতি আল্লাহর বিশেষ রহমত ও ক্ষমার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। এটি কোনো কৌশল নয়, বরং দয়াময়ের অসীম অনুগ্রহেরই প্রকাশ, যার মাধ্যমে বান্দার পাপ মোচনের পথ সুগম হয়েছে।
গানের পরবর্তী অংশে আল্লাহর পার্থিব নেয়ামতসমূহের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। শিশুর জন্য মায়ের স্নেহ ও দুধ, পিতার স্নেহ, জীবিকার জন্য মাঠের শস্য, এবং নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে গৃহ- এ সবই মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্রষ্টার অগণিত দান। এগুলো মানুষের অজান্তেই তার জীবনকে সহজ ও সুসংহত করে তোলে, যা আল্লাহর অদৃশ্য করুণারই বহিঃপ্রকাশ। এছাড়া, পারলৌকিক মুক্তির দিকেও আল্লাহ মানুষকে পথনির্দেশ দিয়েছেন। ঈদের আনন্দের প্রতীকী চাঁদ এবং আলো মানুষকে যেমন পার্থিব আনন্দে উদ্বুদ্ধ করে, তেমনি তা আখেরাতের আলো ও বেহেশতের পথেরও ইঙ্গিত বহন করে। এই পথপ্রদর্শনের জন্য আল্লাহ নবীদের প্রেরণ করেছেন এবং মানবজীবনে নিয়মিত স্মরণ হিসেবে আজান ও মসজিদের ডাক রেখেছেন, যাতে মানুষ বারবার সঠিক পথে ফিরে আসতে পারে।
মূলত এই গানের মূল বিষয় হলো তওবা ও শোকরগুজারি। অর্থাৎ নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে স্রষ্টার অসীম দয়া ও নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। এখানে আল্লাহ কেবল বিচারক নন, বরং পরম দয়ালু অভিভাবক, যিনি বান্দার প্রতিটি ভুলের মাঝেও করুণার দরজা উন্মুক্ত করে রাখেন।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের জুন (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪৭) মাসে টুইন রেকর্ড কোম্পানি গানটির একটি রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৪১ বৎসর ১ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [কবি নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৫৭৯। পৃষ্ঠা: ১৭৭।
- রেকর্ড: টুইন। [জুন ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪৭)। নম্বর এফটি ১৩৩৩৩। শিল্পী: আব্বাসউদ্দীন আহমদ। সুর: নজরুল ইসলাম।][শ্রবণ নমুনা]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: নীলিমা দাস। [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, ঊনত্রিশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। শ্রাবণ ১৪১৩/আগষ্ট ২০০৬] ১২ সংখ্যক গান। আব্বাসউদ্দীন আহমদ-এর রেকর্ডে গাওয়া গান অনুসারে স্বরলিপি করা হয়েছে। [নমুনা]
- সুরকার: কাজী নজরুল ইসলাম
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলামী গান। হামদ
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল: কাহারবা
- গ্রহস্বর: না