তুমি আঘাত দিয়ে মন ফেরোবে (tumi aghat diye mon ferobe)

তুমি আঘাত দিয়ে মন ফেরোবে এই কি তোমার আশা?
আমার যে নাথ অনন্ত সাধ, অনন্ত পিপাসা॥
            দাহন তুমি করবে যত
            প্রেমের শিখা জ্বলবে তত
সে যে আমার মন্ত্র পূজার তোমার কঠিন ভাষা॥
ফুলমালী! ফুলের শাখা কাটো যত পার,
আহত সেই ফুল-শাখাতে ধরবে কুসুম আরো।
            হানলে আঘাত নিথর জলে,
            অধীর বেগে ঢেউ উথলে,
তোমার অবহেলায় বিপুল হ'ল ভীরু ভালোবাসা।
                        আমার ভীরু ভালোবাসা॥

  • ভাবসন্ধান: আধ্যাত্মিক দর্শনের অনন্য রূপ এই গানে উপস্থাপিত হয়েছে। আঘাত, অবহেলা ও দুঃখের মধ্য দিয়েই প্রেমের গভীরতা ও অমরত্বকে  উপস্থাপন করা হয়েছে। এখানে প্রেম কেবল অনুভূতি নয়, বরং এক অনন্ত সাধনা ও আত্মিক আকাঙ্ক্ষার নাম।

    গানের সূচনায় ভক্ত প্রশ্নের সুরে বলেন—“তুমি আঘাত দিয়ে মন ফেরোবে এই কি তোমার আশা?'। এই পংক্তিতে বাহ্যিক আঘাতের বিপরীতে ভক্তের অন্তর্গত দৃঢ়তা প্রকাশ পেয়েছে। ভক্তের হৃদয়ে রয়েছে 'অনন্ত সাধ' ও 'অনন্ত পিপাসা'—যা কোনো আঘাত বা বিরহে নিঃশেষ হয় না, বরং আরও গভীরভাবে জাগ্রত হয়। ভক্তের মনে করেন -জীবনে যতই দুঃখ-দহন আসুক, তাতে প্রেমের বিনাশ হয় না, বরং প্রেমের শিখা আরও তীব্রতর হয়ে প্রজ্জ্বলিত হয়। অর্থাৎ শোক হয়ে হয়ে ওঠে শক্তি। কষ্ট এখানে প্রেমের পরিপূরক শক্তি হিসেবে কাজ করে, যা ভক্তিকে আরও পরিশুদ্ধ ও দৃঢ় করে তোলে।

    'ফুলমালী! ফুলের শাখা কাটো যত পার'—এই রূপকে প্রেমের এক গভীর দার্শনিক সত্য নিহিত। মালী যখন গাছের শাখা ছাঁটাই করেন, তখন তা ধ্বংস নয়; বরং নতুন ফুল ফোটার সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। ঠিক তেমনি জীবনের আঘাত, বেদনা ও বিচ্ছেদ মানুষের অন্তরের সুপ্ত প্রেমকে আরও বিকশিত করে। এখানে প্রিয়তম বা স্রষ্টা এক সৃজনশীল নিয়ন্তা, যিনি ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে নতুন সৌন্দর্যের জন্ম দেন।

    'নিথর জলে ঢেউ উথলে'—এই পংক্তিতে অবহেলার আঘাতে ভক্ত হৃদয়ের জাগরণ প্রকাশ পেয়েছে। যে হৃদয় একসময় শান্ত ও নিস্তরঙ্গ ছিল, সেই হৃদয়ই আঘাতে আন্দোলিত হয়ে গভীর আবেগে পূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে ভীরু ও নীরব ভালোবাসা রূপ নেয় প্রবল ও অপ্রতিরোধ্য অনুরাগে।

    সবশেষে, 'তোমার অবহেলায় বিপুল হ’ল ভীরু ভালোবাসা'—এই পংক্তিতে গানের মূল দর্শন প্রকাশিত হয়েছে। অবহেলা বা দূরত্ব প্রেমকে নিঃশেষ করে না; বরং তাকে আরও গভীর, বিস্তৃত ও শক্তিশালী করে তোলে। ভক্তের প্রেম এখানে ভয়ের নয়, বরং আত্মজাগরণের মধ্য দিয়ে মহিমান্বিত হয়ে ওঠে।

    মূলত আঘাত ও দুঃখ প্রেমের শত্রু নয়, বরং তার পরিশুদ্ধির মাধ্যম। কষ্টের মধ্য দিয়েই প্রেম তার চূড়ান্ত শক্তি ও গভীরতা লাভ করে, আর ভীরু অনুভূতি রূপান্তরিত হয় অনন্ত ও অপ্রতিরোধ্য ভালোবাসায়।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের জুন (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪৩) মাসে, টুইন রেকর্ড কোম্পানি গানটি প্রথম রেকর্ড করে। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল  ৩৭ বৎসর ১ মাস।
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৯১২। পৃষ্ঠা: ৫৭৬-৫৭৭]
  • রেকর্ড: টুইন [জুন ১৯৩৬ (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪৩)]। এফটি ৪৩৯৯। শিল্পী রেণু বসু।
  • স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
  • পর্যায়
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। পরমসত্তা। প্রেম
    • সুরাঙ্গ:  স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের সুর
    • তাল:  কাহারবা
    • গ্রহস্বর: সা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।