তুমি দিয়েছ দুঃখ-শোক-বেদনা, তোমারি জয় (tumi diyechho dukkho-shok-bedona, tomari joy)

তুমি দিয়েছ দুঃখ-শোক-বেদনা, তোমারি জয় তোমারি জয়।
ভালোবাস যারে কাঁদাও তাহারে ছলানাময়।
                    তোমারি জয়, তোমারি জয়, তোমারি জয়॥
তুমি কাঁদায়েছ বসুদেব দেবকীরে,
নন্দ যশোদা ব্রজের গোপীরে,
কাঁদাইলে তুমি শত শ্রীমতীরে হে নিরদয়।
            তোমারি জয়, তোমারি জয়, তোমারি জয়॥
তোমারে চাহিয়া কোটি নয়নে বিরহ অশ্রু ঝুরে,
ধরণী যে আজ ডুবু ডুবু শ্যাম সাগর সলিলে পুরে।
ভক্তে কাঁদাতে হে ব্যথা বিলাসী,
যুগে যুগে আসি’ বাজাইলে বাঁশি
তবুও এ-প্রাণ তোমারি পিয়াসি মানে না ভয়।
            তোমারি জয়, তোমারি জয়, তোমারি জয়।

  • ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণের এক গভীর রহস্যময় প্রেমলীলা প্রকাশ পেয়েছে। পরমপ্রিয় কৃষ্ণ তাঁর ভক্তদের কেবল আনন্দই দেন না, বরং দুঃখ, শোক ও বিরহের মধ্য দিয়েও তাঁদের প্রেমকে গভীর ও পরিশুদ্ধ করে তোলেন। কবি মনে করেন- এ সবই তাঁর লীলা। তাই কবি তাঁর সমস্ত আনন্দ-বেদনা, বিরহ-মিলন মধ্যেও তাঁর জয়গান করেছেন। এর মধ্য দিয়ে মূলত কৃষ্ণের অপার মহিমার বন্দনা করা হয়েছে।

    কবি কৃষ্ণের এই লীলার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছেন- তাঁর পার্থিব পিতামাতা বসুদেব-দেবকীর সন্তানকে দূরের রাখার বেদনার কথা। তিনি দুঃখত্রাতা হয়েই পিতামাতার দূখ নিবারণে তৎপর হয়ে ওঠেন নি। আবার বৃন্দাবনের মায়া ত্যাগ  করে কংসবধের জন্য মথুরায় যখন আসেন- তাঁর পালক পিতামাতা নন্দ ও যশোদার মনোবেদনাকে উপেক্ষা করেছেন, ব্রজের গোপীদের বেদনা অগ্রাহ্য করে কাঁদায়েছেন শত ব্রজের শ্রীমতীদের। তাই কবি তাঁর জয়গান করেছেন।

    কবি মনে করেন শ্যাম ভক্তদের হৃদয়ে প্রেমের ব্যথা জাগিয়ে আনন্দ লাভ করেন। তাই তিনি তাঁকে 'ব্যথা বিলাসী; নামেসম্বোধন করেছেন। কারণ তিনি  যুগে যুগে বাঁশির সুরে মানুষকে মোহিত করেছেন, আবার বিরহের আগুনেও দগ্ধ করেছেন। কিন্তু এত দুঃখ, বেদনা ও কান্নার পরও ভক্তের হৃদয় তাঁর প্রেম থেকে বিচ্যুত হয় না। বরং আরও ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তাই কবি বলেন—এই প্রাণ এখনও তোমারই পিয়াসী, কোনো ভয় মানে না। তাই তিনি জয়ধ্বনি দিয়ে বলেছেন- 'তোমারি জয়'।

    এই গানে উপস্থাপিত হয়েছে বৈষ্ণব বিরহতত্ত্ব ও কৃষ্ণপ্রেমের এক গভীর অন্যন্য রূপ। এখানে দুঃখ ও বিরহ নেতিবাচক নয়, বরং ভক্তির মহামূল্য সম্পদ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৪২) মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৬ বৎসর ১ মাস।
     
  • রেকর্ড:
    • এইচএমভি [জুলাই ১৯৩৫ (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৪২)। এন ৭৩৮৯। শিল্পী: ধীরেন দাস] [শ্রবণ নমুনা]
    • ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ডিসেম্বর (শনিবার ৫ পৌষ ১৩৪২) তারিখের নজরুলের সাথে এইচএমভির চুক্তিপত্রে গানটির উল্লেখ ছিল। [শ্রবণ নমুনা]
  • স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: সালাউদ্দিন আহ্‌মেদ [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, পঁচিশতম খণ্ড,  নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। ভাদ্র, ১৪১২/আগস্ট ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দ] ১৪ সংখ্যক গান।[নমুনা]
     
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। বন্দনা
    • সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের গান
    • তাল: তালবিহীন
    • গ্রহস্বর: সা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।