তুমি পিরিতি কি কর হে শ্যাম (tumi piriti ki koro he shyam)
তুমি পিরিতি কি কর হে শ্যাম তৈল মেখে গায়ে।
তাই ধ’রতে গেলে হাত পিছলে যাও হে পালায়ে॥
ননী চরি ক’রে ক’রে হাত পাকিয়ে শ্যাম
নারীর মন চুরি ক’রে বেড়াও অবিরাম,
তাই রাই দিয়াছে নূপুরের বেড়ি বেঁধে পায় (লো)॥
তুমি দিনের বেলা চরাও ধেনু ভ্রমরা হও রাতে,
আর কুলবধূর রইল না কুল ব্রজে মথুরাতে
শ্যাম তোমার গুণে ঘরে ঘরে
সতীন ননদ-জায়ে, হল সতীন ননদ-জায়ে॥
তোমার হাতের বাঁশি রাতের বেলা সিঁদকাঠি যে হয়
তোমার চুরি কে ধ’রবে হে চোর মহাশয়।
কবে আমার ঘরে বন্দী হয় রইবে চুরির দায়ে॥
- ভাবসন্ধান: এই রঙ্গাত্মক গানে বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণের চিরচেনা বাল্যলীলার দুষ্টুমি, কৈশোরের প্রেমলীলা পালিয়ে বেড়ানো- ধরা না দেওয়া কৃষ্ণের চিরচেনা রূপকে উপস্থাপন করা হয়েছে। গায়ে তেল মাখা চোরকে যেমন ধরতে গেলে হাত পিছলে পালিয়ে যায়। তেমনি প্রেম-চোর-কৃষ্ণকে ধরে রাখা যায় না। শৈশবে যেমন ননী-চোর কৃষ্ণ পালিয়ে যেতেন। তেমনি বৃন্দবনের কিশোর প্রেমিক নারীর মন চুরি পালিয়ে গেছেন। তাদের কাছে তিনি অধর রয়ে গেছেন। তাই রাধা তাঁর প্রেম-চরণে বেঁধে দিয়েছিলেন প্রেমের নূপুর।
তিনি দিনের বেলায় মাঠে গরু চরান, আর রাতে ভ্রমর হয়ে প্রেমের গুঞ্জনে ব্রজকুলবধূদের জাগিয়েছে প্রেমের দুরাশা। কৃষ্ণের এই প্রেমলীলা ব্রজের কুলবধূদেরও অস্থির করে তুলেছে। ফলে ঘরে ঘরে সতীন-ননদের ঝগড়ার মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে—এটি অতিরঞ্জিত কৌতুকের মাধ্যমে কৃষ্ণের সর্বজনপ্রিয়তার পরিচয় বহন করে।
“তোমার হাতের বাঁশি রাতের বেলা সিঁদকাঠি যে হয়”—এই পঙ্ক্তি অত্যন্ত চমৎকার রূপকধর্মী। কৃষ্ণের বাঁশির সুর এমনই মোহনীয় যে, তা যেন হৃদয়ের বন্ধ দরজায় সিঁদ কাটে। অর্থাৎ, বাঁশির সুর শুনে নারীরা নিজেদের সংযম ও সামাজিক বাধা ভুলে কৃষ্ণের দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।
শেষে গানের বক্তা মজার ছলে বলেন—কবে কৃষ্ণ তাঁর ঘরে 'চুরির দায়ে' বন্দী হবেন! এখানে বাহ্যিকভাবে অভিযোগ থাকলেও, অন্তরে রয়েছে কৃষ্ণকে চিরদিন নিজের কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। অর্থাৎ, প্রেমিকাকে হৃদয়চোর কৃষ্ণের কাছেই আত্মসমর্পণ করতে দেখা যায়।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের মে (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৭) মাসে, সেনোলা রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। গানটি প্রকাশিত হয়েছিল নজরুল ইসলামের ৪০ বৎসর ১১ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার শেষের দিকে।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২) -এর ২৪৩ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৬৭২।
- রেকর্ড: সেনোলা [মে ১৯৪০ (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৭)। কিউএস ৪৭০। শিল্পী: কমলা দেবী (হাজরা)। সুর: নজরুল ইসলাম]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ-বন্দনা। রঙ্গার্থ।