তুমি বিরাজ কোথা হে উৎসব দেবতা (tumi birajo kotha he utshob debota)

তুমি বিরাজ কোথা হে উৎসব দেবতা
মম গৃহ অঙ্গনে এসো সঙ্গী হয়ে আনো আনন্দ বারতা॥
            পূজা সম্ভারে প্রসন্ন দৃষ্টি হানো
            শুভ শঙ্খ বাজাও দশদিক জাগানো
হে মঙ্গলময়! আসি’ অভয় দানো আনো প্রভাত আকাশ সম নির্মলতা॥
            লহ বিহগের গীতি অভিনন্দন
            চাঁদের থালিকা হতে গোপীচন্দন
আনন্দ অমরার নন্দন হে প্রণত কর চরণে কহ কথা কহ কথা॥

  • ভাবসন্ধান: কবি এক গভীর আধ্যাত্মিক আহ্বানের মাধ্যমে “উৎসব দেবতা”-কে নিজের হৃদয় ও গৃহে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এখানে “উৎসব দেবতা” মূলত আনন্দ, মঙ্গল, শান্তি ও ঈশ্বরীয় চেতনার প্রতীক। গানটির প্রতিটি পংক্তিতে মানবমনের পবিত্রতা, সৌন্দর্যবোধ এবং আত্মিক জাগরণের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে।

     'তুমি বিরাজ কোথা হে উৎসব দেবতা'- এই আহ্বানের মধ্যে রয়েছে এক ব্যাকুল অনুসন্ধান। কবি যেন জানতে চাইছেন, সেই চিরআনন্দময় দেবতা কোথায় বিরাজমান, যিনি মানুষের জীবনে সত্যিকারের আনন্দ ও উৎসবের সঞ্চার করেন। তিনি তাঁকে নিজের “গৃহ অঙ্গনে” আসার আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। এখানে গৃহ অঙ্গন কেবল বাহ্যিক সংসার নয়, মানুষের অন্তরলোকেরও প্রতীক। কবি চান, সেই দেবতা তাঁর জীবনে এসে আনন্দের বার্তা বয়ে আনুন।

    তাই তিনি পূজা সম্ভারে তাঁর প্রসন্ন দৃষ্টি হানার অনুরোধ করেছেন। কবি তাঁর সাধনা, পূজা ও নিবেদনকে গ্রহণ করার জন্য দেবতার কৃপাদৃষ্টি প্রার্থনা করছেন। দশদিক জাগানো শুভ শঙ্খ বাজানোর নিবেদন করেছন। যেন এর মাধ্যমে মঙ্গলধ্বনি ও শুভ চৈতন্যের জাগরণ ঘটে। শঙ্খধ্বনি এখানে অশুভ দূর করে শুভশক্তির আগমনের প্রতীক। এই মঙ্গলময়কে আহ্বান করেছেন অভয় উপস্থোতিতে। এই প্রার্থনায় কবি দেবতার কাছে ভয়মুক্তি ও মানসিক শান্তি কামনা করেছেন। উপমা হিসেবে ব্যবহার করেছে প্রভাত আকাশ সম নির্মলতা। এই উপমায় কামনা করা হয়েছে এমন এক পবিত্র ও স্বচ্ছ হৃদয়, যা ভোরের আকাশের মতো নির্মল ও কলুষমুক্ত।

    প্রকৃতির উপাদান দিয়ে দেবতাকে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে। পাখির গান যেন অভিনন্দন সংগীত হয়ে উঠেছে, আর চাঁদের থালিকা থেকে গোপীচন্দন এনে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, সমগ্র প্রকৃতি আনন্দ ও ভক্তিভরে সেই দেবতার আগমনকে স্বাগত জানাচ্ছে। আনন্দ অমরা-নন্দন দেবতার পায়ে প্রণত প্রণামে দেবতার সঙ্গে অন্তরঙ্গ সংলাপের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। কবি শুধু দূর থেকে পূজা করতে চান না; তিনি চান দেবতা তাঁর সঙ্গে কথা বলুন, তাঁর হৃদয়কে স্পর্শ করুন, জীবনের গভীর সত্য উপলব্ধি করান। সার্বিকভাবে, গানটি আনন্দময় ঈশ্বরচেতনার আহ্বান, অন্তরের পবিত্রতা লাভের আকাঙ্ক্ষা এবং ভক্তিময় আত্মসমর্পণের এক অনুপম কাব্যিক প্রকাশ।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল (চৈত্র ১৩৪৪-বৈশাখ ১৩৪৫) মাসে, টুইন রেকর্ড কোম্পানি গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করে। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ১০ মাস রচিত হয়েছিল।
  • গ্রন্থ:
    • নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্‌ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮। গান ৯৮৫। পৃষ্ঠা ৩০২]
  • রেকর্ড: টুইন [এপ্রিল ১৯৩৮ (চৈত্র ১৩৪৪-বৈশাখ ১৩৪৫)] এফটি ১২৩৩৭। শিল্পী: কার্তিক চন্দ্র দাস।
     
  • সুরকার: কাজী নজরুল ইসলাম
  • স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: আহসান মুর্শেদ [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি সাতচল্লিশতম খণ্ড। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। ফাল্গুন ১৪২৫/ফেব্রুয়ারি ২০১৯] পৃষ্ঠা: ৫২-৫৩  [নমুনা]
     
  • পর্যায়
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন ধর্ম। উৎসব দেবতা
    • সুরাঙ্গ: ভজন
    • তাল: কাহারবা
    • গ্রহস্বর:

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।