তুমি সুন্দর যবে নব রূপ ধর (tumi shundor jobe nobo rup dhor)
তুমি সুন্দর যবে নব রূপ ধর হও সুন্দরতর।
অধর-চাঁদ ধরা দাও যবে ধরা ধামে লীলা কর॥
আমাদের সাথে যবে কাঁদ হাস
প্রিয় হয়ে সখা হয়ে ভালোবাস
বিভূতি তোমার লুকাইয়া আস রাখালিয়া সাজ পর॥
শঙ্খ-চক্র-গদা ও পদ্ম ফেলি যবে ধর বাঁশি
তখনি তোমার প্রেমে উন্মাদ গোপী রূপে ছুটে আসি।
বিরাট বিপুল তুমি চিন্ময়
ভাবিতে ও রূপ মনে লাগে ভয়
মোর কাছে তুমি চির মধুময় মদন মনোহর॥
- ভাবসন্ধান: এই গানের মাধ্যমে বিষ্ণুর রূপ-মাধুর্য, লীলাময়তা এবং ভক্তের অন্তরঙ্গ প্রেমভাব এক অপূর্ব কাব্যিক ব্যঞ্জনায় উপস্থাপন করা হয়েছে। এখানে বিষ্ণুকে একদিকে অসীম, বিরাট ও চিন্ময় সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, আবার অন্যদিকে তিনি ভক্তের কাছে নিকটতম প্রিয়জন—সখা বা প্রেমিক রূপে তথা বিষ্ণুর দ্বৈত রূপ—ঐশ্বরিক মহিমা ও মানবিক মাধুর্য—একত্রে প্রকাশিত হয়েছে। ভক্তের কাছে বিষ্ণু তখনই সর্বাধিক প্রিয় হয়ে ওঠেন, যখন তিনি তাঁর অসীম শক্তি আড়াল করে প্রেমময়রূপে আবির্ভূত হন। এইভাবেই ভক্তি পরিণত হয় এক গভীর, অন্তরঙ্গ ও অনির্বচনীয় প্রেমের অভিজ্ঞতালব্ধ পরমসত্তা।
বিষ্ণু তাঁর পার্থিব লীলায় নানা রূপ ধারণ করেন। এবং প্রতিটি নবরূপই কবির কাছে হয়ে ওঠে সুন্দরতর। তিনি যখন মর্ত্যে অবতীর্ণ হয়ে লীলা করেন, তখন তাঁর সেই মধুর রূপ ভক্তের হৃদয়কে মোহিত করে। এখানে “অধর-চাঁদ” উপমাটি বিষ্ণুর অপার্থিব সৌন্দর্য ও মাধুর্যের প্রতীক, যা ভক্তের অন্তরে প্রেমের আলো জাগিয়ে তোলে।
পরবর্তী অংশে বিষ্ণুকে এক অনন্য রূপে চিত্রিত করা হয়েছে। এ রূপে তিনি ভক্তের সঙ্গে কাঁদেন, হাসেন, ভালোবাসেন। এ রূপে তিনি আর দূরবর্তী সর্বশক্তিমান হয়ে বিরাজ করেন না, বরং তার চেয়ে বেশি হয়ে ওঠেন অন্তরঙ্গ সঙ্গী বা সখা। তিনি তাঁর ঐশ্বরিক বিভূতি আড়াল করে সাধারণ রাখালের বেশে কৃষ্ণরূপে অবতীর্ণ হন। এই 'রাখালিয়া সাজ' মূলত শ্রীকৃষ্ণের লীলার ইঙ্গিত বহন করে, যেখানে বিষ্ণু তাঁর মহিমা গোপন করে সরল, মানবিক রূপে ভক্তের কাছে আসেন। এরপর কবি বলেন, যখন বিষ্ণু শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী ঐশ্বরিক রূপ ত্যাগ করে বাঁশি ধারণ করেন, তখনই ভক্তরা (গোপীরূপে) তাঁর প্রেমে উন্মাদ হয়ে তাঁর দিকে ছুটে আসে। এখানে বাঁশির সুর ভক্তির আহ্বান—যা শুনে ভক্তরা সব বন্ধন ছিন্ন করে বিষ্ণুর এই নবতর রূপের দিকে ধাবিত হয়।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ জুলাই (সোমবার ১১ শ্রাবণ ১৩৪৩) নজরুলের সাথে রেকর্ড কোম্পানির চুক্তি হয়। এই চুক্তি তালিকায় এই গানটি ছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৭ বৎসর ২ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২) -এর ১৯২১ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৫৭৯।
- রেকর্ড: রেকর্ড কোম্পানির সাথে চুক্তি [২৭ জুলাই ১৯৩৬ (সোমবার ১১ শ্রাবণ ১৩৪৩)]
- পর্যায়:
- ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। বিষ্ণু। বন্দনা