তোমার পূজার ফুল ফুটেছে মাগো আমার মনে (tomar pujar ful futechhe mago amar mone)

তোমার পূজার ফুল ফুটেছে মাগো আমার মনে।
তুমিই এসে লহ সে ফুল তোমার শ্রীচরণে॥
কখন তুমি মনের ভুলে
চরণ দিয়ে হৃদয় ছুঁলে,
কমল হয়ে ফুটল্‌ হিয়া তোমার পরশনে॥
মাগো, সে ফুল ঠাঁই পাবে কি তোমার গরার মালায়?
সে ফুল কবে রাখব তোমার নিবেদনের থালায়?
তোমার চলার পথের ধূলি
ছেয়ে দিলাম সে ফুল তুলি’
কবে তারে দলবে পায়ে চলতে আনমনে॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে এই দেবীকে কোনো বিশেষ নাম অভিহিত করা হয় নি। কিন্তু গানের ভাবানুসারে ধারণা করা যায়, এই দেবী পরমসত্তারূপিণী আদ্যাশক্তি দুর্গার প্রতি ভক্তের গভীর আত্মনিবেদনের ভাব অপূর্বরূপে উপস্থাপিত হয়েছে। ভক্ত অনুভব করেন যে, তাঁর অন্তরে এতদিন যে ভক্তি, প্রেম ও সাধনা বিরাজ করছিল, তা আজ পবিত্র ফুলের মতো প্রস্ফুটিত হয়েছে। আদ্যাশক্তির প্রেমে বিকশিত এই হৃদয়-ফুল তিনি মায়ের শ্রীচরণে নিবেদন করতে চান।

    ভক্ত বিশ্বাস করেন, হয়তো অজান্তেই দেবীর চরণস্পর্শে তাঁর হৃদয়ে এই কমল ফুটে উঠেছে। মূলত, দেবীর কৃপা ও পরশে ভক্তহৃদয়ের এই কমল-প্রস্ফুটনকে কবি আধ্যাত্মিক জাগরণের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এখন ভক্ত তাঁর হৃদয়ের এই ফুল দিয়ে একটি মালা গেঁথে দেবীর গলায় পরাতে চান। কিন্তু তাঁর মনে সংশয় জাগে—সেই মালা কি দেবী গ্রহণ করবেন? তাঁর এই নিবেদন কি দেবীর পূজার উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবে? তাই তাঁর হৃদয়ে আকুল প্রশ্ন জাগে- 'সে ফুল কবে রাখব তোমার নিবেদনের থালায়?' এই প্রশ্নের মধ্যে ভক্তের গভীর বিনয়, আত্মসমালোচনা এবং নিজের অযোগ্যতার বোধ প্রকাশ পেয়েছে।

    গানের শেষাংশে আত্মসমর্পণের ভাব আরও গভীর হয়ে উঠেছে। ভক্ত তাঁর হৃদয়ের ফুল তুলে মায়ের চলার পথের ধূলির ওপর বিছিয়ে দিতে চান। তিনি কামনা করেন, দেবী যখন আপন মনে সেই পথে চলবেন, তখন তাঁর চরণস্পর্শে সেই ফুল ধন্য হবে। এখানে ভক্তের আকাঙ্ক্ষা নিজের গৌরব বা স্বীকৃতি লাভ নয়; বরং দেবীর চরণধূলি লাভ করাই তাঁর পরম প্রাপ্তি। তিনি চান তাঁর জীবন, প্রেম, ভক্তি ও সাধনা সম্পূর্ণরূপে আদ্যাশক্তির সেবায় উৎসর্গিত হোক।

    সার্বিকভাবে, এই গানটি মাতৃরূপী আদ্যাশক্তির প্রতি এক ভক্তের গভীর প্রেম, বিনয়, কৃতজ্ঞতা ও আত্মনিবেদনের মর্মস্পর্শী প্রকাশ। হৃদয়ের পবিত্র ভক্তিভাবকে ফুলের প্রতীকে রূপায়িত করে কবি দেখিয়েছেন যে, ঈশ্বরপ্রেমে প্রস্ফুটিত হৃদয়ই মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ পূজার্ঘ্য।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৯২৬ গান। পৃষ্ঠা: ৫৮০।
  • পর্যায়: 
    • বিষয়াঙ্গ:ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। আদ্যাশক্তি। সাধারণ। আত্মনিবেদন

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।