তোমারি আশায় সব সুখ ছাড়িনু (tomari ashay shob shukh chharinu)

তোমারি আশায় সব সুখ ছাড়িনু
আর কেন রাখ প্রভু দূরে।
তুমি ছেড়ো না মোরে মোর গিরিধারী
বাঁধো মোরে চরণ-নূপুরে॥
বিরহ বেদনা মোর জ্বলে হৃদিকন্দরে
মুছাইয়া দাও আঁখিলোর।
তব চিত্তে মিলায় আজি চিত্ত হে মম
অঙ্গে মিলাও তব অঙ্গ পীতম।
জনমে জনমে মীরা তোমারি দাসী
হৃদি-বৃন্দাবনে নিতি ঝুরে॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানটি মীরাবাঈয়ের ভজন অবলম্বনে রচিত। তাই এর সমগ্র ভাবধারা মীরার কৃষ্ণপ্রেমকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। এতে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি এক প্রেমমগ্ন ভক্ত মীরার গভীর আত্মনিবেদন, বিরহবেদনা এবং পরম মিলনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। তিনি পার্থিব জীবনের সকল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে শ্রীকৃষ্ণের চরণে সমর্পণ করেছেন। তাঁর একমাত্র প্রত্যাশা কৃষ্ণের সান্নিধ্য ও প্রেমলাভ। কিন্তু সেই প্রেমলাভ থেকে বঞ্চিত হয়ে তিনি আকুল কণ্ঠে প্রশ্ন করেন—যাঁর আশায় তিনি সকল সুখ বিসর্জন দিয়েছেন, সেই প্রভু কেন তাঁকে এখনও দূরে রাখবেন?

    গানের প্রথম অংশে মীরার আত্মসমর্পণের ভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি গিরিধারী শ্রীকৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করেন, যেন কৃষ্ণ তাঁকে কখনো ত্যাগ না করেন। “বাঁধো মোরে চরণ-নূপুরে”—এই পঙ্‌ক্তির মাধ্যমে তিনি প্রকাশ করেছেন যে, নূপুরের মতো কৃষ্ণের চরণে চিরদিন আবদ্ধ হয়ে থাকতে চান। কৃষ্ণের সান্নিধ্য থেকে এক মুহূর্তের জন্যও বিচ্ছিন্ন হওয়া তাঁর কাম্য নয়। এটি ভক্তির চরম আত্মনিবেদন ও নিত্যসান্নিধ্য লাভের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

    পরবর্তী অংশে কৃষ্ণবিরহে মীরার অন্তরের গভীর বেদনা প্রকাশিত হয়েছে। প্রিয়তম কৃষ্ণের বিচ্ছেদে তাঁর হৃদয়ের অন্তঃস্থলে বিরহের আগুন জ্বলছে এবং সেই বেদনায় তাঁর নয়ন অশ্রুসজল। তাই তিনি প্রার্থনা করেন, কৃষ্ণ যেন তাঁর অশ্রু মুছে দেন এবং বিরহের যন্ত্রণা লাঘব করেন। এখানে বিরহ কেবল দুঃখ নয়; বৈষ্ণব ভাবধারায় এটি কৃষ্ণপ্রেমের সর্বোচ্চ অনুভূতি, যা ভক্তকে তাঁর আরাধ্য সত্তার আরও নিকটে নিয়ে যায়।

    গানের শেষাংশে মীরার আকাঙ্ক্ষা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি চান, তাঁর চিত্ত কৃষ্ণের চিত্তে বিলীন হয়ে যাক এবং তাঁর সত্তা কৃষ্ণসত্তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে উঠুক। “অঙ্গে মিলাও তব অঙ্গ পীতম”—এই প্রার্থনার মধ্যে আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলনের আকাঙ্ক্ষা নিহিত রয়েছে। এটি ভক্তির সেই উচ্চতম স্তর, যেখানে ভক্ত নিজের পৃথক অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে সম্পূর্ণভাবে প্রভুর প্রেমে বিলীন হতে চান।

    শেষে মীরা নিজেকে জন্মজন্মান্তরের কৃষ্ণদাসী হিসেবে পরিচয় দেন। তাঁর হৃদয়ই যেন বৃন্দাবন, আর সেই হৃদি-বৃন্দাবনে তিনি নিত্য শ্রীকৃষ্ণের বিরহে কাতর হয়ে থাকেন। এই বিরহ তাঁর কাছে কেবল বেদনা নয়, বরং প্রেমসাধনার এক মহামূল্য সম্পদ। কারণ এই আকুলতাই তাঁকে সর্বক্ষণ কৃষ্ণস্মরণে নিমগ্ন রাখে এবং তাঁর প্রেমকে ক্রমশ গভীরতর করে তোলে।

    সার্বিকভাবে, এই গানটি তে পাওয়া যায়- মীরার কৃষ্ণপ্রেম, আত্মসমর্পণ, বিরহসাধনা এবং আত্মা-পরমাত্মার মিলনের আকাঙ্ক্ষার এক হৃদয়স্পর্শী প্রকাশ। এতে বৈষ্ণব প্রেমভক্তির সেই চিরন্তন আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে, যেখানে ভক্তের একমাত্র কামনা—প্রিয়তম শ্রীকৃষ্ণের চরণে চিরআশ্রয় লাভ।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম থেকে নজরুল পুরোপুরি নির্বাক ও স্থবির হয়ে গিয়েছিলেন।
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৩৬০ গান। 
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। মীরার আত্মনিবেদন

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।