তোর রাঙা পায়ে মা শ্যামা (tor ranga paye maa shyama)
তোর রাঙা পায়ে মা শ্যামা আমার প্রথম পূজার ফুল।
ভজন, পূজন জানি না মা হয়ত হবে কতই ভুল॥
দাঁড়িয়ে দ্বারে ‘মা মা’ বলে
ভাসি আমি নয়ন জলে।
ভয় হয় মা ছুঁই কেমনে মা তোর পূজার বেদী-মূল॥
আশ্রয় মোর নাই জননী ত্রিভুবনে কোথাও হায়!
দাঁড়াই মাগো কাহার কাছে তুইও যদি ঠেলিস পায়।
হানে হেলা সবাই যা’রে
তুই নাকি কোল দিস্ মা তা’রে
আমি সেই আশাতে এসেছি মা অকূলে তুই দে মা কূল॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে মাতৃরূপিণী শ্যামার প্রতি এক দীন, অসহায় ও শরণাগত ভক্তের গভীর ভক্তি, বিনয় এবং করুণাপ্রার্থনার মর্মস্পর্শী প্রকাশ ঘটেছে। হৃদয়ের সরল ভক্তিভাবকে পূজার ফুলের প্রতীকে রূপায়িত করে কবি দেখিয়েছেন যে, ঈশ্বরের কৃপালাভের জন্য আচারজ্ঞান নয়, বরং আন্তরিক আত্মসমর্পণ ও বিশ্বাসই মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ পূজার্ঘ্য।
গানটির স্থায়ীতে মাতৃরূপিণী শ্যামাকে পূজা নিবেদন করতে গিয়ে ভক্ত অকপটে স্বীকার করেছেন যে, তিনি আচার-অনুষ্ঠান ও শাস্ত্রজ্ঞানের দিক থেকে অযোগ্য। তাই তিনি একটি ফুল দিয়েই দেবীর চরণে তাঁর পূজার্ঘ্য অর্পণ করেছেন। এখানে ‘প্রথম পূজার ফুল’ কেবল একটি ফুল নয়; এটি তাঁর হৃদয়ে জাগ্রত প্রথম ভক্তি, প্রেম ও আত্মনিবেদনের প্রতীক। তিনি স্বীকার করেন যে, ভজন-পূজনের নিয়মকানুন তাঁর জানা নেই, ফলে তাঁর উপাসনায় নানা ত্রুটি ও ভুল থাকতে পারে। কিন্তু সেই অজ্ঞতা সত্ত্বেও তিনি আন্তরিক হৃদয়ে মায়ের শরণ গ্রহণ করতে এসেছেন। এই স্বীকারোক্তির মধ্যে ভক্তের গভীর বিনয় ও অহংশূন্যতার পরিচয় ফুটে উঠেছে।
গানটির অন্তরায় ভক্তের তীব্র আবেগতাড়িত ভক্তির উচ্ছ্বাস প্রকাশ পেয়েছে। তিনি মন্দিরের দ্বারে দাঁড়িয়ে বারবার ‘মা, মা’ বলে ডাকছেন এবং তাঁর চোখ অশ্রুতে ভরে উঠছে। এখানে অশ্রু ভক্তির আন্তরিকতা ও অন্তরের ব্যাকুলতার প্রতীক। তিনি ভয় পান, এমন পবিত্র পূজাবেদীর কাছে যাওয়ার যোগ্যতা তাঁর আছে কি না। এই দ্বিধা মূলত নিজের অযোগ্যতার বোধ থেকে উৎসারিত। কারণ সত্যিকার ভক্ত কখনো নিজের সাধনাকে বড় করে দেখেন না; বরং ঈশ্বরের অসীম মহিমার সামনে নিজেকে ক্ষুদ্র বলে অনুভব করেন।
গানটির সঞ্চারীতে ভক্ত তাঁর জীবনের গভীর অসহায়তার কথা ব্যক্ত করেছেন। তিনি অনুভব করেন যে, ত্রিভুবনে তাঁর কোনো আশ্রয় নেই। যদি মাতৃরূপিণী শ্যামাও তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেন, তবে তাঁর আর কোথাও যাওয়ার পথ থাকবে না। এই আর্ত আবেদন ভক্তের সম্পূর্ণ শরণাগতির পরিচয় বহন করে। তিনি মাকে জীবনের একমাত্র ভরসা ও শেষ আশ্রয়রূপে গ্রহণ করেছেন।গানটির আভোগে ভক্ত মায়ের অসীম করুণার কথা স্মরণ করেছেন। তিনি শুনেছেন, যাদের সবাই অবহেলা করে, যাদের সমাজ গ্রহণ করে না, মা তাঁদেরই আপন কোলে তুলে নেন। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি মায়ের কাছে এসেছেন। ‘অকূলে তুই দে মা কূল’—এই প্রার্থনার মাধ্যমে তিনি সংসারের দুঃখ, অনিশ্চয়তা ও বিপদের সাগর থেকে মুক্তি কামনা করেছেন। এখানে ‘অকূল’ মানবজীবনের দুঃখময় ও দিশাহীন অবস্থার প্রতীক, আর ‘কূল’ মায়ের করুণা, আশ্রয় ও মুক্তির প্রতীক।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৫০) মাসে কলম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি এই গানের একটি রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪৪ বৎসর ৭ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৯০৯। পৃষ্ঠা: ৫৭৬]
- রেকর্ড: কলম্বিয়া [সেপ্টেম্বর ১৯৪৩ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৫০)। জিই ২৬০৫। শিল্পী: উত্তরা দেবী। সুর নিতাই ঘটক]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। শ্যামা। আত্মনিবেদন