তৌহিদেরি বান ডেকেছে সাহারা মরুর দেশে (touhideri baan dekechhe shahara morur deshe)
তৌহিদেরি বান ডেকেছে সাহারা মরুর দেশে
দুনিয়া জাহান ডুবু-ডুবু সেই স্রোতে যায় ভেসে॥
সেই জোয়ারে আমার নবী পারের তরী নিয়ে
'আয় কে যাবি পারে' ─ ডাকে দ্বারে দ্বারে গিয়ে
যে চায় না তারেও নেয় সে নায়ে আপনি ভালবেসে॥
পথ দেখায় সে ঈদের চাঁদের পিদিম নিয়ে হাতে
হেসে, হেসে, দাঁড় টানে চা'র আস্হাব তাঁরি সাথে।
নামাজ-রোজার ফুল-ফসলে শ্যামল হ'ল মরু
প্রেমের রসে উঠ্ল পুরে নীরস মনের তরু
খোদার রহম এলো রে আখেরি নবীর বেশে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে কবি ইসলামের আবির্ভাব, তাওহিদের (একত্ববাদের) মহান আদর্শ এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মানবকল্যাণমূলক ভূমিকার চিত্র অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।
গানের শুরুতে কবি বলেন, আরবের সাহারা মরুভূমিতে তাওহিদের এক মহাপ্লাবন বয়ে গিয়েছিল। সেই প্লাবন কেবল একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল না। কালক্রমে তার প্রভাব সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে।
যখন অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও অন্যায়ের অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল আরব-উপদ্বীপের মানবসমাজ। সেই সময় মহানবী মুহাম্মদ (সা.) মানবজাতির মুক্তির নৌকা নিয়ে আবির্ভূত হন তৌহিদের বাণী নিয়ে। তিনি মানুষকে সত্য, ন্যায় ও মুক্তির পথে আহ্বান জানান। তাঁর আহ্বান ছিল সর্বজনীন—তিনি ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষকে ডেকেছেন। শুধু যারা স্বেচ্ছায় সাড়া দিয়েছে তাই নয়, তাঁর সীমাহীন প্রেম ও করুণার পরশে অনাগ্রহী মানুষের প্রতিও তিনি মমতা প্রদর্শন করেছেন এবং তাদের কল্যাণ কামনা করেছেন।
কবি নবীকে পথপ্রদর্শকেরূপে কল্পনা করেছেন। তাঁর হাতে ঈদের চাঁদের মতো আলোকবর্তিকা, যা অন্ধকারে পথহারা মানুষকে সঠিক পথ দেখায়। তাঁর চারজন ঘনিষ্ঠ সাহাবি—খলিফাগণ—তাঁর সঙ্গে থেকে এই সত্য ও ন্যায়ের বার্তা প্রচারে সহযোগিতা করেছেন। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ইসলামের আদর্শ দূরদূরান্তে বিস্তার লাভ করে।
নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ইসলামী অনুশাসনের মাধ্যমে মানুষের জীবন ও সমাজে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও পবিত্রতার বিকাশ ঘটে। ফলে শুষ্ক মরুভূমিও যেন ফুল-ফসলে শ্যামল হয়ে ওঠে। এখানে মরুভূমি শুধু আরবের প্রকৃতিকেই নির্দেশ করে না; বরং মানুষের অনুর্বর ও নীরস হৃদয়েরও প্রতীক। ইসলামের প্রেম, মানবতা ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শ সেই হৃদয়কে সজীব ও উর্বর করে তোলে।
গানের শেষাংশে কবি ঘোষণা করেন যে, আল্লাহর অসীম রহমত ও করুণা মানবজাতির কাছে শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে পৌঁছেছে। তাঁর আবির্ভাব মানবতার জন্য শান্তি, মুক্তি ও কল্যাণের এক মহান আশীর্বাদ।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে (চৈত্র ১৩৪৪-বৈশাখ ১৩৪৫) টুইন রেকর্ড কোম্পানি গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করে। সম্ভবত এই রেকর্ডটি প্রকাশের কিছু আগে গানটি রচিত হয়েছিল। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ১০ মাস রচিত।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২ খ্রিষ্টাব্দ। ৭৩ সংখ্যক গান।
- জুলফিকার দ্বিতীয় [ডিসেম্বর, ১৯৫২ (পৌষ ১৩৫৯ বঙ্গাব্দ)]
- রেকর্ড: টুইন [এপ্রিল ১৯৩৮ (চৈত্র ১৩৪৪-বৈশাখ ১৩৪৫) এফটি ১২৩৫৫। শিল্পী: আব্বাসউদ্দীন। সুর: গিরীন চক্রবর্তী][শ্রবণ নমুনা]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি: সুধীন দাশ। নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি তৃতীয় খণ্ড (নজরুল ইন্সটিটিউট)। পৃষ্ঠা ১০৯-১১২] [নমুনা]
- সুরকার: গিরীন চক্রবর্তী
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ রসুল
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল: কাহারবা
- গ্রহস্বর: সমা।