ত্রাণ কর মওলা মদিনার, উম্মত তোমার গুনাহ্‌গার কাঁদে (tran koro mawla madinar, ummat tomar gunahgar kande)

ত্রাণ কর মওলা মদিনার, উম্মত তোমার গুনাহ্‌গার কাঁদে।
তব প্রিয় মুসলিম দুনিয়া পড়েছে আবার গুনাহের ফাঁদে॥
            নাহি কেউ ঈমানদার, নাহি নিশান-বরদার,
            মুসলিম জাহানে নাহি আর পরহেজগার,
            জামাত শামিল হতে যায় না মসজিদে,
            পড়ে নাকো কোরআন মানে না মুর্শিদে;
ভুলিয়াছে কল্‌মা শাহাদাত, পড়ে না নামাজ ঈদের চাঁদে॥
            নাহি দান খয়রাত, ভুলে মোহ ফাঁসে
            মেতে আছে সবে বিভবে বিলাসে;
            বসিয়াছে জালিম শাহী তখ্‌তে তব 

            মজলুমের এ ফরিয়াদ আর কাহে কব,
তলোয়ার নাহি আর, পায়ে গোলামীর জিঞ্জির বাঁধে॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে কবি মুসলিম সমাজের ধর্মীয়, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অবক্ষয়ের এক বেদনাময় চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি মুসলিম উম্মাহর ঈমানি দুর্বলতা, ইসলামের আদর্শ থেকে বিচ্যুতি এবং পরাধীনতার করুণ অবস্থার কথা স্মরণ করে মহান আল্লাহর দরবারে করুণ আবেদন জানিয়েছেন। গানের মূল সুর হলো আত্মসমালোচনা, অনুতাপ এবং আল্লাহর রহমত প্রার্থনা।

    প্রার্থনামূলক ভঙ্গিতে রচিত এই গানের সূচনায় কবি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি নিবেদন করে বলেন— হে মদিনার প্রিয় নেতা, তোমার উম্মত আজ গুনাহের সাগরে নিমজ্জিত। তারা পাপের ফাঁদে আবদ্ধ হয়ে আল্লাহর নির্দেশিত পথ থেকে দূরে সরে গেছে। তাই তিনি উম্মতের মুক্তি ও কল্যাণ কামনা করে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন।

    কবি হতাশার সুরে বলেছেন- আজ মুসলিম সমাজে খাঁটি ঈমানদার লোক নেই, ইসলামের নিশান বহনকারী নেই, পরহেজগার (আল্লাহভীরু, তাকওয়াবান) মানুষ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তার এই হাহাকার মুসলমানদের অবক্ষয়ের জন্য।

    এরপর কবি গভীর আক্ষেপের সঙ্গে মুসলিম সমাজের অধঃপতনের চিত্র অঙ্কন করেন। তাঁর মতে, সমাজে প্রকৃত ঈমানদার, ইসলামের পতাকাবাহী এবং পরহেজগার মানুষের সংখ্যা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। অনেক মুসলমান জামাতে নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে যায় না, কোরআনের শিক্ষা অনুসরণ করে না এবং আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকের উপদেশও মানে না। এমনকি তারা কালিমা শাহাদাতের তাৎপর্য ও ইসলামের মৌলিক আদর্শকেও ভুলে যাচ্ছে। ফলে ধর্মীয় অনুশাসন ও আত্মিক মূল্যবোধ তাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।

    গানের পরবর্তী অংশে কবি বলেন, মানুষ দান-খয়রাত, মানবসেবা ও পারস্পরিক সহমর্মিতার শিক্ষা বিস্মৃত হয়ে পার্থিব মোহ, ভোগ-বিলাস ও সম্পদের আকর্ষণে মগ্ন হয়ে পড়েছে। বৈষয়িক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে তারা নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক গুণাবলি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এর ফলে সমাজে স্বার্থপরতা, অন্যায় ও অবিচার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

    কবি আরও উল্লেখ করেন যে, জালিম ও অত্যাচারীরা ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে, আর মজলুম ও নির্যাতিত মানুষের আর্তনাদ শোনার কেউ নেই। একসময় যে মুসলিম জাতি সত্য, ন্যায় ও স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করত, আজ তারা নিজেদের শক্তি, সাহস ও আত্মমর্যাদা হারিয়ে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছে। 'তলোয়ার নাহি আর, পায়ে গোলামীর জিঞ্জির বাঁধে'-এই পঙ্ক্তিতে কবি মুসলিম সমাজের দুর্বলতা ও স্বাধীনতাহীন অবস্থার প্রতীকী চিত্র তুলে ধরেছেন।

    মূলত, এই গানে কবি মুসলিম সমাজের ধর্মীয় ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণগুলো তুলে ধরে আত্মসমালোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি আল্লাহর করুণা ও দিকনির্দেশনা কামনা করেছেন, যাতে মুসলমানরা পুনরায় ঈমান, ন্যায়নীতি, মানবতা ও ইসলামের প্রকৃত আদর্শে ফিরে এসে নিজেদের হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে পারে।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৪) মাসে, টুইন রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড করা হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ৩ মাস।
     
  • গ্রন্থ:
    • জুলফিকার
      • দ্বিতীয় সংস্করণ [ডিসেম্বর, ১৯৫২ (পৌষ ১৩৫৯ বঙ্গাব্দ)] ২৯ সংখ্যক গান।
      • নজরুল রচনাবলী সপ্তম খণ্ড [কার্তিক ১৪১৯, নভেম্বর ২০১২। জুলফিকার দ্বিতীয় খণ্ড। ৫। পৃষ্ঠা ৯৩]
    • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২) -এর ৫১২ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ১‌৫৭।
  • রেকর্ড: টুইন [সেপ্টেম্বর ১৯৩৭ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৪)]। এফটি ১২১০০। শিল্পী: আব্বাসউদ্দীন।  [শ্রবণ নমুনা]
     
  • সুরকার: সুবল দাশগুপ্ত
     
  • স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
    • সুধীন দাশ [নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, চৌত্রিশতম খণ্ড, (একুশে বই মেলা। ফাল্গুন ১৪১৮/ফেব্রুয়ারি ২০১২)]। ১৩তম গান। পৃষ্ঠা: ৪০-৪২]।  [নমুনা]
       
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ-রসুল। প্রার্থনা
    • সুরাঙ্গ: ভাটিয়ালি

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।