থির হয়ে তুই ব'স দেখি মা খানিক আমার আঁখির আগে (thir hoye tui bosh dekhi ma)

থির হয়ে তুই ব'স দেখি মা খানিক আমার আঁখির আগে
দেখব নিত্য লীলাময়ী থির হলে তুই কেমন লাগে॥
         শান্ত হ'লে ডাকাত মেয়ে
        কেমন দেখায় দেখব চেয়ে (মা গো)
চিন্ময় শিব শম্ভু কেন চরণ-তলে শরণ মাগে॥
দেখব চেয়ে জননী তুই সাকারা না নিরাকারা
কেমন করে কালি হয়ে নামে ব্রহ্ম জ্যোতিধারা।
        কোলে নিতে কোলের ছেলে
        শ্মশান জাগিস বাহু মেলে
কেমন ক'রে মহামায়া তোর বুকে মায়া জাগে॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে কবি মাতৃরূপিণী দেবী কালীর রহস্যময় ও পরস্পরবিরোধী স্বভাবকে উপলব্ধি করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন।

    দেবী কালী সাধারণত ভয়ংকর, চঞ্চল ও সংহারশক্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত। কবি তাই তাঁকে অনুরোধ করেছেন, তিনি যেন কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে বসেন, যাতে তাঁর প্রকৃত স্বরূপ গভীরভাবে দর্শন করা যায়। কবির বিশ্বাস, দেবীর বহিরঙ্গের উগ্রতা ও ভয়ংকর রূপের অন্তরালে লুকিয়ে আছে অপরিসীম শান্তি, করুণা ও চিরসুন্দরের প্রকাশ। কবি জানতে চান, যাঁকে ‘ডাকাত মেয়ে’ বা সমস্ত কিছু হরণকারী শক্তি বলা হয়, তিনি শান্ত ও স্থির হলে কেমন দেখান। তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে ভাবেন, কেন চৈতন্যময়, সর্বশক্তিমান শিবও তাঁর চরণে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। এর মধ্য দিয়ে দেবীর সর্বোচ্চ শক্তি ও মহিমার স্বীকৃতি ব্যক্ত হয়েছে।

    পরবর্তী অংশে কবি দেবীর দার্শনিক স্বরূপ অনুধাবনের চেষ্টা করেছেন। তিনি জানতে চান, দেবী কি সাকার না নিরাকার—অর্থাৎ দৃশ্যমান রূপধারিণী, না কি রূপাতীত পরমসত্তা। তাঁর কাছে বিস্ময়কর মনে হয়, কীভাবে নিরাকার ব্রহ্মের জ্যোতির্ময় শক্তি কালীরূপে প্রকাশিত হয়। এখানে কালীকে ব্রহ্মশক্তির দৃশ্যমান প্রকাশ হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে।

    শেষাংশে কবি দেবীর মাতৃত্ববোধের রহস্য তুলে ধরেছেন। যিনি শ্মশানবাসিনী, সংহারকারিণী ও মৃত্যুর অধিষ্ঠাত্রী, তিনিই আবার সন্তানের জন্য বাহু প্রসারিত করে স্নেহময়ী জননী হয়ে ওঠেন। কবি বিস্মিত হয়ে জানতে চান, সেই মহামায়ার হৃদয়ে কীভাবে মাতৃস্নেহ ও মায়ার উচ্ছ্বাস জাগে। এভাবেই গানটিতে দেবী কালীর ভয়ংকর ও স্নেহময়, নিরাকার ও সাকার, সংহারক ও পালনকারিণী—এই দ্বৈত অথচ সমন্বিত রূপের গভীর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়েছে।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের জুন (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪৭) মাসে এইচএমভি গানটির একটি রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৪১ বৎসর ১ মাস।
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২) -এর ৩৮৪ সংখ্যক গান। 
  • রেকর্ড: এইচএমভি  [জুন ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪৭)। নম্বর এন ১৭৭৬৫। শিল্পী: মৃণালকান্তি ঘোষ। সুর: নজরুল ইসলাম। রামপ্রসাদী] [শ্রবণ নমুনা]
     
  • স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি: সুধীন দাশ।  [নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, ত্রয়োদশ খণ্ড। প্রথম সংস্করণ। নজরুল ইন্সটিটিউট জ্যৈষ্ঠ ১৪০১/মে ১৯৯৪। ১৬ সংখ্যক গান] [নমুনা]
     
  • সুরকার: কাজী নজরুল ইসলাম
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। কালী। সাধারণ
    • সুরাঙ্গ:রামপ্রসাদী

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।