দাও দাও দরশন পদ্ম-পলাশ লোচন (dao dao dorshon podmo-polash lochon)

দাও দাও দরশন পদ্ম-পলাশ লোচন,
        কেঁদে দু’নয়ন হ’ল অন্ধ।
আকাশ বাতাস ঘেরা, তব ও মন্দির বেড়া
        আর কতকাল রবে বন্ধ॥
পাখি যেমন সন্ধ্যাকালে, বন্ধু-স্বজন পালে পালে
উড়ে এসে ব’সেছিল ডালে হে।
রাত পোহালে একে একে, উড়ে গেল দিগ্বিদিকে,
        প’ড়ে আছি একা নিরানন্দ।
টুটিল বাঁধন মায়ার, কবে শুনিব এবার
        ও রাঙা চরণ নূপুর ছন্দ॥
দুখ-শোক রৌদ্রজলে, ফেলে মোরে পলে পলে
        ছলিতেছ হরি কত ছল হে
জীবনের বোঝা প্রভু, বহিতে কি হবে তবু
        সহিতে পারি না আর দ্বন্দ্ব।
মরণের সোনার ছোঁওয়ায়, ডেকে লও ও রাঙা পায়
        দেখাও এবার মুখ-চন্দ॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীহরির দর্শনলাভের আকাঙ্ক্ষায় ব্যাকুল এক ভক্তের গভীর বিরহবেদনা, সংসারবিমুখতা এবং মুক্তিলাভের আকুতি উপস্থাপিত হয়েছে। জীবনের নানা দুঃখ, বিচ্ছেদ ও অনিত্যতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ভক্ত উপলব্ধি করেছেন যে, জাগতিক কোনো কিছুই স্থায়ী নয়। তাই তিনি সংসারের মায়াবন্ধন অতিক্রম করে শ্রীহরির সান্নিধ্য ও চিরশান্তি কামনা করেছেন।

    গানটির স্থায়ীতে ভক্ত শ্রীহরির কাছে তাঁর দর্শন প্রার্থনা করেছেন। তিনি তাঁকে পদ্ম-পলাশ-লোচন' বলে সম্বোধন করে আকুল কণ্ঠে নিবেদন করেন যে, দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও বিরহের অশ্রুধারায় তাঁর দুই নয়ন যেন অন্ধ হয়ে এসেছে। তিনি অনুভব করেন যে, চারদিকে আকাশ-বাতাসে প্রভুর উপস্থিতির আভাস থাকলেও তাঁর সঙ্গে প্রত্যক্ষ মিলনের পথ যেন এখনও রুদ্ধ। তাই তাঁর জিজ্ঞাসা- আর কতকাল তাঁর দর্শনের দ্বার বন্ধ থাকবে?

     


    প্রথম অন্তরায় কবি সংসারজীবনের অনিত্যতার চিত্র তুলে ধরেছেন। সন্ধ্যাবেলায় যেমন পাখিরা দলে দলে এসে আশ্য় নেয় বৃক্ষশাখায়। রাত্রিশেষে ডানা মেলে উড়ে যায় দিগ্বিদিকে। তেমনি যাপিত জীবনের যাত্রাপথে বন্ধু-স্বজন ও আপনজনেরা একসময় মিলিত হলেও কালক্রমে দূরে সরে যায়। সঙ্গহীন সঙ্গীহীন ভক্ত একাকী  পড়ে থাকেন নিরানন্দ রিক্ত গৃহে। এই নিঃসঙ্গতার মধ্যেই তাঁর উপলব্ধি, সংসারের সব সম্পর্কই ক্ষণস্থায়ী। তাই তিনি প্রতীক্ষায় থাকেন এই প্রত্যাশায়- কবে তাঁর মায়ার বন্ধন ছিন্ন হবে এবং কবে তিনি শ্রীহরির রাঙা চরণের নূপুরধ্বনি শুনতে পাবেন। এখানে ‘নূপুর ছন্দ’ ঈশ্বরের সান্নিধ্য ও দিব্য আহ্বানের প্রতীক।

    দ্বিতীয় অন্তরায় ভক্ত জীবনের দুঃখ-কষ্টের কথা ব্যক্ত করেছেন। সংসারের দুঃখ, শোক, প্রতিকূলতা ও নানাবিধ পরীক্ষার মধ্যে তিনি নিজেকে প্রতিনিয়ত ক্লান্ত ও অবসন্ন বোধ করেন। তাঁর মনে হয়, শ্রীহরি যেন নানাভাবে তাঁকে পরীক্ষা করছেন। জীবনের বোঝা বহন করতে করতে তিনি পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। এখানে ভক্ত শ্রীহরিরর কাছে সংসারজীবনের ক্লেশ থেকে মুক্তির প্রার্থনা নিবেদন করেছেন।

    গানের শেষাংশে ভক্ত মৃত্যুকে ভয়ের বিষয় হিসেবে নয়, বরং পরম মিলনের সেতু হিসেবে কল্পনা করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, মৃত্যুর 'সোনার ছোঁয়া'য়- তাঁকে জাগতিক বন্ধন থেকে মুক্ত করে প্রভুর চরণে পৌঁছে দেবে। তাই তাঁর প্রার্থনা- শ্রীহরি যেন তাঁকে তাঁর রাঙা চরণে ডেকে নেন এবং তাঁর চন্দ্রসম স্নিগ্ধ মুখমণ্ডলের দর্শন দান করেন। এখানে মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয় বরং জীবাত্মার সাথে পরমসত্তার সঙ্গে মিলনের পথ।

    সার্বিকভাবে, এই গানটি শ্রীহরির দর্শনলাভের জন্য ব্যাকুল এক ভক্তের বিরহ, সংসারের অনিত্যতার উপলব্ধি, মায়াবন্ধন থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং মৃত্যুকে পরম মিলনের দ্বার হিসেবে গ্রহণ করার আধ্যাত্মিক ভাবনাকে প্রকাশ করেছে। ভক্তের সমস্ত আকাঙ্ক্ষা, বেদনা ও সাধনার চূড়ান্ত লক্ষ্য একটিই—পরমসত্তার সান্নিধ্য ও চিরশান্তির লাভ।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি  (মাঘ-ফাল্গুন ১৩৩৯) মাসে গানটি প্রথম এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৩ বৎসর ৮ মাস।
     
  • রেকর্ড: এইচএমভি । [ফেব্রুয়ারি ১৯৩৩ (মাঘ-ফাল্গুন ১৩৩৯)। এন ৭০৮১।  শিল্পী: মৃণালকান্তি ঘোষ। ]  [শ্রবণ নমুনা]
  • গ্রন্থ:
    • গীতি-শতদল
      • প্রথম সংস্করণ [বৈশাখ ১৩৪১। এপ্রিল ১৯৩৪। ভৈরবী-কাওয়ালি]।[গীতি-শতদল-৬৫]
      • নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, পঞ্চম খণ্ড। বাংলা একাডেমী, ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১। গীতি-শতদল। গান সংখ্যা ৬৫।  ভৈরবী-কাওয়ালি। পৃষ্ঠা ৩২০]
         
  • স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি: সালাউদ্দিন আহ্‌মেদ [নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, অষ্টাদশ খণ্ড। প্রথম সংস্করণ। নজরুল ইন্সটিটিউট আশ্বিন ১৪০৪/অক্টোবর ১৯৯৩। ১৫ সংখ্যক গান] [নমুনা]
     
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। হরি। প্রার্থনা
    • সুরাঙ্গ: স্বকীয়

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।