দাও দেখা দাও দেখা (dao dekha dao dekha)

দাও দেখা দাও দেখা হরি পদ্ম-পলাশ-লোচন!
এত কাঁদি, ডাকি, তবু শোন নাকি হে প্রভু ব্যথা-বিমোচন!
শুনিয়াছি হরি জননীর কাছে
তুমি আছ যার, তার সব আছে
তুমি অনাথের নাথ –
কেহ নাই যার তুমি আছ তার অনাথের নাথ!
(আমি) অনাথ বালক, জগৎ জগৎ-পালক, দাও শ্রীচরণ শরণ’॥

  • ভাবসন্ধান:  ধ্রুব  চলচ্চিত্রের জন্য রচিত এই গানটিতে শ্রীহরির প্রতি এক ভক্তের গভীর নির্ভরতা, দর্শনলাভের ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষা, ঈশ্বরের করুণার প্রতি অটল বিশ্বাস এবং চরণাশ্রয় লাভের প্রার্থনা উপস্থাপিত হয়েছে। ভক্তের একমাত্র কামনা—জগৎ-পালক শ্রীহরির তাঁর শ্রীচরণে স্থান দিক এবং তাঁর সান্নিধ্যে জীবন হয়ে উঠুক পরম প্রশান্তির।

    ভক্ত অনুভব করেন যে, সংসারের সকল দুঃখ, অভাব ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও একমাত্র শ্রীহরিই তাঁর আশ্রয় ও ভরসা। তাই তিনি গভীর ব্যাকুলতায় প্রভুর দর্শন ও চরণাশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। গানের সূচনাতেই ভক্ত শ্রীহরিকে ‘পদ্ম-পলাশ-লোচন’ বলে সম্বোধন করে তাঁর দর্শন কামনা করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি অশ্রুসজল নয়নে প্রভুকে ডেকে চলেছেন, কিন্তু এখনও তাঁর দর্শন লাভ করতে পারেননি। তাই তাঁর হৃদয়ে এক করুণ প্রশ্ন জাগে—এত কান্না ও প্রার্থনার পরও কি প্রভু তাঁর আর্তি শুনছেন না? এখানে ভক্তের এই প্রশ্নে কোনো অভিযোগ নেই; বরং বিরহজনিত ব্যাকুলতা ও দর্শনলাভের গভীর আকাঙ্ক্ষাই প্রকাশ পেয়েছে। একই সঙ্গে তিনি শ্রীহরিকে ‘ব্যথা-বিমোচন’ বলে স্মরণ করেছেন, কারণ তাঁর বিশ্বাস—মানবজীবনের সকল দুঃখ ও বেদনার একমাত্র উপশমদাতা তিনিই।

    গানটির অন্তরাতে ভক্ত শৈশবে তাঁর জননীর কাছে শোনা এক গভীর সত্যের কথা স্মরণ করেন। তিনি শুনেছেন, যার জীবনে শ্রীহরির যাঁর সহায় আছেন, তার আর কোনো অভাব থাকে না। কারণ প্রভুর কৃপাই মানুষের প্রকৃত সম্পদ। জাগতিক ধন-সম্পদ, সম্পর্ক বা প্রভাব-প্রতিপত্তি ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু ঈশ্বরের সান্নিধ্য ও করুণা চিরস্থায়ী। তাই ভক্তের উপলব্ধি—যার জীবনে প্রভু আছেন, সে প্রকৃত অর্থেই পরিপূর্ণ।

    গানের শেষাংশে ভক্ত শ্রীহরির আরেকটি বিশেষ গুণের কথা স্মরণ করেছেন—তিনি অনাথের নাথ, আশ্রয়হীনের আশ্রয়। ভক্ত নিজেকে এক অনাথ শিশুর সঙ্গে তুলনা করেছেন, যাঁর এই পৃথিবীতে নির্ভর করার মতো কেউ নেই। অন্যদিকে শ্রীহরি সমগ্র জগতের পালনকর্তা। তাই তিনি বিনম্রভাবে তাঁর শ্রীচরণে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। এখানে ‘শরণ’ শব্দটি কেবল নিরাপত্তা বা রক্ষার আবেদন নয়; বরং নিজের সমস্ত অহংকার, দুঃখ, ভয় ও অসহায়ত্ব প্রভুর চরণে সমর্পণ করার প্রতীক।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জানুয়ারি ‘ধ্রুব’ নামক চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। এই চলচ্চিত্রে গানটি ব্যবহৃত হয়েছিল। ধারণা করা হয়, কাজী নজরুল ইসলাম এই চলচ্চিত্রের জন্য ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের কোনো এক সময়ে এই গানটি রচনা করেছিলেন।  এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ৭ মাস।
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৩৭৬।  চলচ্চিত্র : 'ধ্রুব'।  পৃষ্ঠা: ১৯৪৫]
  • চলচ্চিত্র:  ধ্রুব। ক্রাউন টকি হাউস।  ১ জানুয়ারি ১৯৩৪ (সোমবার, ১৭ পৌষ ১৩৪০)।  ধ্রুব-এর গান। শিল্পী: মাষ্টার প্রবোধ]
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। হরি। প্রার্থনা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।