দিন গেল, কই দীনের বন্ধু (din gelo, koi deener bondhu)
দিন গেল, কই দীনের বন্ধু, এলে না ত দিন শেষে!
(মোর) নয়নে রবে কি, হে কৃষ্ণ, চির-কৃষ্ণা তিথির বেশে॥
মোর নয়নের আলো নিভায়েছ প্রিয়তম
কৃষ্ণচন্দ্র হইয়াছে তাই আকাশের চাঁদ মম,
সে কৃষ্ণচাঁদ হৃদয়-গগনে উঠিবে কখন হেসে॥
- ভাবসন্ধান: গিরিশচন্দ্র ঘোষের রচিত 'বিল্বমঙ্গল' রেকর্ডের জন্য নজরুল এই গানটি রচনা করেছিলেন। এই গানে শ্রীকৃষ্ণের দর্শনলাভের জন্য গভীর বিরহ, দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং অন্তরের অন্ধকার দূর করে কৃষ্ণপ্রেমের আলো লাভের আকাঙ্ক্ষার মর্মস্পর্শী আবেগ উপস্থাপিত হয়েছে। এখানে কৃষ্ণ কেবল আরাধ্য দেবতা নন; তিনি ভক্তের জীবনের আলো, আশা ও পরম শান্তির উৎস। এ গানে ভক্ত কৃষ্ণকে ‘দীনের বন্ধু’ বা দুঃখী ও অসহায় মানুষের আশ্রয়দাতা হিসেবে স্মরণ করেছেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও কৃষ্ণের দর্শন না পেয়ে তিনি বেদনাহত হৃদয়ে তাঁকে আহ্বান জানিয়েছেন।
গানের সূচনায় ভক্ত আক্ষেপ করে বলেন যে, দিন প্রায় শেষ হয়ে এল, অথচ দুঃখী মানুষের পরম বন্ধু কৃষ্ণ এখনও তাঁর কাছে আসেন নি। এখানে ‘দিন’ মানুষের জীবনকাল বা পার্থিব জীবনের প্রতীক হিসেবেও ধরা যায়। ভক্তের মনে আশঙ্কা জাগে, জীবনের অবসান ঘনিয়ে এলেও যদি কৃষ্ণের দর্শন না মেলে, তবে তাঁর সমস্ত সাধনাই অপূর্ণ থেকে যাবে। তাই তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে এক গভীর প্রতীক্ষার বেদনা।গানটির অন্তরাতে প্রতীক্ষার গভীর বেদনা ও আগ্রহে ভক্তের মনে জেগেছে আত্মজিজ্ঞাসা। ভক্তের আক্ষেপ তাঁর নয়নে কি চিরকাল ‘কৃষ্ণা তিথি’র অন্ধকারই বিরাজ করবে? এখানে ‘কৃষ্ণা তিথি’ অমাবস্যাপক্ষের অন্ধকারের প্রতীক। কৃষ্ণবিরহে তাঁর হৃদয় ও জীবন আলোহীন দশা। তিনি অনুভব করেন, প্রিয়তম কৃষ্ণ যেন তাঁর চোখের সমস্ত আলো নিভিয়ে দিয়েছেন। এই আলো নিভে যাওয়া কেবল বাহ্যিক দৃষ্টিশক্তির নয়; বরং আনন্দ, আশা ও আত্মিক পরিতৃপ্তির লোপের প্রতীক। ভক্ত এক অপূর্ব রূপকের আশ্রয়ে বলেন, তাঁর জীবনের আকাশে যে চাঁদ উদিত হওয়ার কথা ছিল, সেই কৃষ্ণচন্দ্র এখনও দেখা দেন নি। তাই বাহ্যিক আকাশের চাঁদও তাঁর কাছে অর্থহীন বলে মনে হয়। তাঁর একমাত্র আকাঙ্ক্ষা—হৃদয়-গগনে কৃষ্ণচন্দ্রের উদয়। তিনি প্রতীক্ষা করেন সেই শুভক্ষণটির জন্য, যখন কৃষ্ণ তাঁর অন্তরে আবির্ভূত হয়ে হাসিমুখে তাঁর জীবনকে প্রেম, আনন্দ ও শান্তির আলোয় পূর্ণ করে তুলবেন।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৪৪) এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি 'বিল্বমঙ্গল' একটি রেকর্ড নাটক প্রকাশ করেছিল। এই নাটকে গানটি প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ৬ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইন্সটিটিউট, মাঘ ১৪১৭, ফেব্রুয়ারি ২০১১)। ১৯৪৭ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৫৮৬]
- রেকর্ড: এইচএমভি [ডিসেম্বর ১৯৩৭ (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৪৪)। এন ৯৯৮৪। রেকর্ড নাটক (বিল্বমঙ্গল)। নাট্যকার: গিরিশচন্দ্র ঘোষ। চরিত্র: বিল্বমঙ্গল। এন ৯৯৮৩। শিল্পী: মৃণালকান্তি ঘোষ। সুরকার: নজরুল ইসলাম
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। অন্বেষণ