দীনের হতে দীন দুঃখী অধম যেথা থাকে (deener hote deeno dukkhi odhom jetha thake)

দীনের হতে দীন দুঃখী অধম যেথা থাকে
ভিখারিনী বেশে সেথা দেখেছি মোর মাকে
                        মোর অন্নপূর্ণা মাকে॥
অহংকারের প্রদীপ নিয়ে স্বর্গে মাকে খুঁজি
মা ফেরেন ধূলি পথে যখন ঘটা করে পূজি
ঘুরে ঘুরে দূর আকাশে প্রণাম আমার ফিরে আসে
যথায় আতুর সন্তানে মা কোল বাড়ায়ে ডাকে॥
নামতে নারি তাদের কাছে সবার নীচে যারা
তাদের তরে আমার জগন্মাতা সর্বহারা।
অপমানের পাতাল তলে লুকিয়ে যারা আছে
তোর শ্রীচরণ রাজে সেথা নে মা তাদের কাছে
আনন্দময় তোর ভুবনে আনব কবে বিশ্বজনে
আমি দেখব জ্যোতির্ময়ী রূপে সেদিন তমসাকে
                        আমার অন্নপূর্ণা মাকে॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে কবি জগজ্জননী অন্নপূর্ণারূপিণী দুর্গা-এর মহিমা ও মানবপ্রেমময় রূপকে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর উপলব্ধি, মা অন্নপূর্ণা সমাজের সবচেয়ে দীন-দুঃখী, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের মধ্যেই ভিখারিণীর বেশে বিরাজ করেন। তাই তাঁকে স্বর্গলোকে বা ঐশ্বর্যের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না; তাঁকে পাওয়া যায় মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও অভাবের মাঝে।

    কবি দেখেছেন, মানুষ অহংকার, আড়ম্বর ও জাঁকজমকপূর্ণ পূজার মাধ্যমে দেবীকে লাভ করতে চায়। কিন্তু মা তখন ধূলিমলিন পথে, ক্ষুধার্ত ও নির্যাতিত মানুষের পাশে অবস্থান করেন। যারা স্নেহ, আশ্রয় ও মমতার জন্য আকুল, মা তাঁদেরই কোলে তুলে নেন। তাই কবির প্রণাম দূর আকাশে নয়, ফিরে আসে সেইসব অবহেলিত মানুষের কাছেই, যেখানে জগন্মাতার প্রকৃত আবাস।

    কবি আরও উপলব্ধি করেছেন যে, সমাজের নিচুতলার মানুষের কাছে পৌঁছাতে মানুষের নিজের অহংকার ও সামাজিক সংকোচই প্রধান বাধা। অথচ সর্বস্বহারা, অপমানিত ও অবজ্ঞাত মানুষের মধ্যেই মায়ের শ্রীচরণ বিরাজমান। তাই তিনি মায়ের কাছে প্রার্থনা করেছেন, যেন তাঁকে সেইসব মানুষের সান্নিধ্যে নিয়ে যান এবং তাঁদের সেবা করার যোগ্যতা দান করেন।

    এই গানের অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো—প্রকৃত মাতৃসাধনা মন্দিরের আচার-অনুষ্ঠানে নয়, বরং দুঃখী ও বঞ্চিত মানুষের সেবায়। কবি এমন এক মানবিক, সাম্যভিত্তিক ও কল্যাণময় সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে সকল মানুষ মর্যাদা, ভালোবাসা ও আনন্দের অধিকারী হবে। সেদিন অন্ধকার, বৈষম্য ও অবহেলার পরিবর্তে সর্বত্র জগন্মাতার জ্যোতির্ময় রূপের প্রকাশ ঘটবে, এবং মানুষ সত্যিকার অর্থে অন্নপূর্ণার মহিমা উপলব্ধি করতে পারবে।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে এপ্রিল (বৃহস্পতিবার ১৫ বৈশাখ ১৩৪৫) এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানির সাথে নজরুলের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তিপত্রে গানটি ছিল।  এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ১১ মাস।
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২)। ৭৯৩ সংখ্যক গান]
  • রেকর্ড:
    • এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানির সাথে নজরুলের চুক্তি। ২৮শে এপ্রিল ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দ (বৃহস্পতিবার ১৫ বৈশাখ ১৩৪৫)।
    • এইচএমভি। এপ্রিল ১৯৪৪ (চৈত্র ১৩৫০-বৈশাখ ১৩৫১)। এন ২৭৪৪৪। শিল্পী: মৃণালকান্তি ঘোষ  [শ্রবণ নমুনা]
       
  • স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: নিখিলরঞ্জন নাথ [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, তেইশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। কার্তিক ১৪০৯ নভেম্বর ২০০২ খ্রিষ্টাব্দ] ১১ সংখ্যক গান। [নমুনা]
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম, শাক্ত। অন্নপূর্ণা
    • সুরাঙ্গ: স্বকীয়
    • তাল: দাদরা
    • গ্রহস্বর: র্সা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।