দূর বনান্তের পথ ভুলি কোন্ বুলবুলি (dur bonanter poth vuli kon bulbuli)
দূর বনান্তের পথ ভুলি কোন্ বুলবুলি বুকে মোর আসিলি হেথায়।
হায় আনন্দের দূত যে তুই, তবু তোর চোখে কেন জল কি ব্যথায়॥
কোথা দিই ঠাঁই তোরে ওরে ভীরু পাখি, বেদনাময় আমার ও প্রাণ,
এ মরুতে নাই তরু, নাই তোর তৃষার তরে জল যে হেথায়॥
নিকুঞ্জে কার গাইতে গেলি গান, বিঁধিল বুক কণ্টকে;
হায় পুড়িয়া বৈশাখে এলি ভিজিতে অশ্রুর বরষায়॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে এক দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ের সঙ্গে আরেক আহত ও ব্যথাতুর প্রাণের আত্মিক মিলনের চিত্র ফুটে উঠেছে। কবি একটি পথভ্রষ্ট বুলবুলির রূপক ব্যবহার করে এমন এক সত্তার কথা প্রকাশ করেছেন, যে আনন্দের বার্তা নিয়ে এলেও নিজেই গভীর বেদনার ভার বহন করছে। ফলে গানটি মানবমনের নিঃসঙ্গতা, সহমর্মিতা, ব্যর্থ প্রেম, বেদনার ভাগাভাগি এবং আহত হৃদয়ের পারস্পরিক আশ্রয়-অন্বেষণের এক মর্মস্পর্শী প্রকাশ হয়ে উঠেছে। গানের সূচনায় কবি বিস্ময়ভরে প্রশ্ন করেন—দূর বনান্তরের পথ হারিয়ে কোন্ বুলবুলি তাঁর হৃদয়ে এসে আশ্রয় নিল? সাধারণত বুলবুলি আনন্দ, সৌন্দর্য ও সুমধুর গানের প্রতীক। তাই তিনি তাকে 'আনন্দের দূত' বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, যে পাখি আনন্দের বার্তা বহন করে আনার কথা, তার চোখেও অশ্রু। এই বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, বাহ্যিক সৌন্দর্য বা হাসির আড়ালেও গভীর বেদনা লুকিয়ে থাকতে পারে। তাই তিনি জানতে চান, কোন্ দুঃখ বা ব্যথা এই আনন্দদূতের হৃদয়কে বিষণ্ণ করেছে।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি নিজের অসহায় অবস্থার কথা ব্যক্ত করেছেন। তিনি বুলবুলিকে আশ্রয় দিতে চান, কিন্তু অনুভব করেন যে তাঁর নিজের হৃদয়ই বেদনায় পূর্ণ। তাই তিনি প্রশ্ন করেন- এমন এক দুঃখময় প্রাণে তিনি কীভাবে ওই ভীরু ও ক্লান্ত পাখিটিকে আশ্রয় দেবেন? তিনি নিজের হৃদয়কে মরুভূমির সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে নেই কোনো সবুজ তরু, নেই তৃষ্ণা নিবারণের জল। এই 'মরু' মানুষের অন্তরের শূন্যতা, নিঃসঙ্গতা ও বেদনার প্রতীক। অর্থাৎ তিনি নিজেই শান্তিহীন, তাই অন্যের দুঃখ মোচনের শক্তিও তাঁর নেই।
গানের শেষাংশে কবি বুলবুলির অতীতের বেদনার কারণ অনুমান করার চেষ্টা করেছেন। তিনি কল্পনা করেন, হয়তো পাখিটি কোনো নিকুঞ্জে প্রেমের গান গাইতে গিয়েছিল; কিন্তু সেখানে কণ্টকের আঘাতে তার হৃদয় বিদীর্ণ হয়েছে। এখানে 'কণ্টক' প্রেমের ব্যর্থতা, প্রত্যাখ্যান বা জীবনের নির্মম আঘাতের প্রতীক। বৈশাখের দহন যেমন প্রকৃতিকে শুষ্ক ও ক্লান্ত করে তোলে, তেমনি জীবনের কঠোর অভিজ্ঞতা বুলবুলির হৃদয়কে পুড়িয়ে দিয়েছে। তাই সে এখন অশ্রুর বর্ষায় নিজেকে সিক্ত করতে এসেছে। এই অশ্রুবর্ষা দুঃখের মধ্য দিয়ে আত্মার প্রশান্তি ও বেদনার পরিশুদ্ধির প্রতীক।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। বুলবুল পত্রিকার ভাদ্র-অগ্রহায়ণ ১৩৪০ (আগষ্ট-ডিসেম্বর ১৯৩৩) সংখ্যায় গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ৩৪ বৎসর ছিল ৩ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ২১৮১। পৃষ্ঠা: ৬৫৬]
- পত্রিকা: বুলবুল [ভাদ্র-অগ্রহায়ণ ১৩৪০ (আগষ্ট-সেপ্টেম্বর ১৯৩৩)]
- রেকর্ড: এইচএমভি [ফেব্রুয়ারি ১৯৩৪ (মাঘ-ফাল্গুন ১৩৪০)। পি ১১৭৭৯। শিল্পী: ইন্দুবালা।]
- স্বরলিপিকার:
- সেলিনা হোসেন। [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, একান্নতম খণ্ড, কবি নজরুল ইন্সটিটিউট, আষাঢ় ১৪২৭। জুন ২০২১। রেকর্ডে ইন্দুবালা'র গাওয়া গানের সুরানুসারে স্বরলিপি করা হয়েছে। গান সংখ্যা ১৫। পৃষ্ঠা: ৭০-৭৩। [নমুনা]
- সেলিনা হোসেন। [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, একান্নতম খণ্ড, কবি নজরুল ইন্সটিটিউট, আষাঢ় ১৪২৭। জুন ২০২১। রেকর্ডে ইন্দুবালা'র গাওয়া গানের সুরানুসারে স্বরলিপি করা হয়েছে। গান সংখ্যা ১৫। পৃষ্ঠা: ৭০-৭৩। [নমুনা]
- পর্যায়: