দে জাকাত, দে জাকাত, তোরা দে রে জাকাত (de zakat, de zakatz tora de re zakat)
দে জাকাত, দে জাকাত, তোরা দে রে জাকাত।
তোর দিল্ খুলবে পরে ওরে আগে খুলুক হাত॥
দেখ পাক্ কোর্আন শোন্ নবীজীর ফরমান
ভোগের তরে আসেনি দুনিয়ায় মুসলমান।
তোর একার তরে দেননি খোদা দৌলতের খেলাত॥
তোর দর্ দালানে কাঁদে ভুখা হাজারো মুসলিম
আছে দৌলতে তোর তাদেরও ভাগ, বলেছেন রহিম।
বলেছেন রহমানুর রহিম, বলেছেন রসুলে করিম।
সঞ্চয়ে তোর সফল হবে পাবি রে নাজাত॥
এই দৌলত বিভব রতন যাবে না তোর সাথে
হয়তো চেরাগ জ্বলবে না তোর গোরে শবেরাতে।
এই জাকাতের বদলাতে পাবি বেহেশ্তী সওগাত॥
- ভাবানুসন্ধান: এই গানে ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিধান জাকাত প্রদানের গুরুত্ব, সামাজিক ন্যায়বোধ, মানবকল্যাণ এবং সম্পদের প্রকৃত দায়িত্ব সম্পর্কে গভীর শিক্ষা উপস্থাপিত হয়েছে। কবি মুসলমানদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ধন-সম্পদ কেবল ব্যক্তিগত ভোগের জন্য নয়; বরং সমাজের অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিত মানুষেরও এর উপর অধিকার রয়েছে। তাই জাকাতের মাধ্যমে সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন ও মানবিক সহমর্মিতার আদর্শ প্রতিষ্ঠাই এই গানের মূল প্রতিপাদ্য।
গানের সূচনায় কবি মুসলমানদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন- তারা যেন জাকাত প্রদান করে। তবে তিনি কেবল হাত খুলে দান করার কথা বলেননি; বরং হৃদয় উন্মুক্ত করার কথাও বলেছেন। এখানে 'হাত খোলা' দানের প্রতীক এবং 'দিল খোলা' উদারতা, সহানুভূতি ও মানবপ্রেমের প্রতীক। কবির মতে, প্রকৃত জাকাত তখনই পূর্ণতা লাভ করে, যখন তা আন্তরিকতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়।
প্রথম অন্তরায় কবি কোরআন ও মহানবী (সা.)-এর নির্দেশনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মুসলমান পৃথিবীতে কেবল ভোগ-বিলাসের জন্য আগমন করেনি। আল্লাহ যে সম্পদ দান করেছেন, তা এককভাবে ভোগ করার জন্য নয়; বরং সমাজের কল্যাণে ব্যয় করার জন্যও। ধন-সম্পদ আল্লাহর আমানত, আর সেই আমানতের মধ্যে দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষেরও নির্ধারিত অধিকার রয়েছে। তাই সম্পদের প্রতি একচ্ছত্র মালিকানার মনোভাব ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী।
দ্বিতীয় অন্তারাতে কবি সমাজের দরিদ্র মানুষের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, ধনীদের অট্টালিকার পাশেই অসংখ্য ক্ষুধার্ত মানুষ কষ্টে দিন কাটায়। অথচ তাদের জীবিকার একটি অংশ আল্লাহ ধনীদের সম্পদের মধ্যেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। রহমান, রহিম এবং রাসূলের বাণীর উল্লেখ করে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, জাকাত কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; বরং এটি দরিদ্রের ন্যায্য অধিকার এবং ইসলামের একটি ফরজ বিধান।
শেষ অন্তরাতে কবি মানুষের পার্থিব সম্পদের নশ্বরতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। মৃত্যুর পর ধন-সম্পদ, প্রাসাদ কিংবা জাগতিক ঐশ্বর্য কোনো কিছুই মানুষের সঙ্গে যাবে না। এমনকি মৃত্যুর পর তাঁর কবরেও হয়তো কোনো প্রদীপ জ্বলবে না। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রদত্ত জাকাত মানুষের পরকালের পাথেয় হয়ে থাকবে। তাই কবি বিশ্বাস করেন, জাকাতের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর রহমত, মুক্তি এবং জান্নাতের পুরস্কার লাভ করতে পারে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ জুলাই (সোমবার ১১ শ্রাবণ ১৩৪৩) মাসে, নজরুলের সাথে রেকর্ড কোম্পানির চুক্তি হয়। এই চুক্তি তালিকায় এই গানটি ছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৭ বৎসর ২ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৫৮৬।]
- রেকর্ড:
- রেকর্ড কোম্পানির সাথে চুক্তি [২৭ জুলাই ১৯৩৬ (সোমবার ১১ শ্রাবণ ১৩৪৩)]
- টুইন [সেপ্টেম্বর ১৯৩৬ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৩)। এফটি ৪৫৭১। শিল্পী: আব্বাসউদ্দীন আহমদ] [শ্রবণ নমুনা]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
- নীলিমা দাস। [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, একত্রিশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। ফাল্গুন, ১৩৯৭ বঙ্গাব্দ/ ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দ] ১২ সংখ্যক গান। আব্বাসউদ্দীন আহমদ-এর গাওয়া গানের সুরানুসারে স্বরলিপি করা হয়েছে। [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলামি গান। জাকাত
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল: কাহারবা
- গ্রহস্বর: সা