নন্দকুমার বিনে সই আজি বৃন্দাবন অন্ধকার (nondokumar bine shoi aji brindabon ondhokar)

নন্দকুমার বিনে সই আজি বৃন্দাবন অন্ধকার
                                    নাহি ব্রজে আনন্দ আর।
যমুনার জল দ্বিগুন বেড়েছে ঝরি' গোকুলে অশ্রুধার॥
শীতল জানিয়া মেঘ-বরণ শ্যামের শরণ লইয়া সই
তৃষিতা চাতকী জ্বলে মরি হায় বিরহ-দাহনে ভস্ম হই।
শীতল মেঘে অশনি থাকে
কে জানিত সখি সজল কাজল শীতল মেঘে অশনি থাকে।
ব্রজে বাজে না বেণু আর চরে না ধেনু
(আর) পড়ে না গোকুলে শ্যাম চরণ রেণু
তার ফেলে যাওয়া বাঁশি নিয়ে শ্রীদাম সুদাম
ধায় মথুরার পথে আর কাঁদে অবিরাম।
কৃষ্ণে না হেরি দূর বন পার উড়ে গেছে শুক সারি
কৃষ্ণ যেথায় সেই মথুরায় চলো যাই ব্রজনারী॥

  • ভাবসন্ধান: পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, কংসবধের উদ্দেশ্যে শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবন ত্যাগ করে মথুরায় গমন করেন। কৃষ্ণের এই প্রস্থান শুধু একটি স্থান পরিবর্তন নয়; এর ফলে আনন্দময় বৃন্দাবন এক গভীর শূন্যতা ও বিরহবেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সেই কৃষ্ণবিরহের করুণ চিত্রই এই গানে উপস্থাপিত হয়েছে।

    গানের সূচনায় ‘সই’ সম্বোধনকারী নারীটির পরিচয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তিনি হতে পারেন রাধা, অথবা ব্রজের কোনো সাধারণ কৃষ্ণপ্রেমিকা। তবে তাঁর কণ্ঠের মধ্য দিয়ে সমগ্র ব্রজবাসীর হৃদয়ের বেদনা প্রকাশ পেয়েছে। কৃষ্ণবিহীন বৃন্দাবন তাঁর কাছে আনন্দহীন, বিষাদময় অন্ধকারে নিমজ্জিত। কৃষ্ণের অনুপস্থিতিতে ব্রজের নর-নারীর চোখের অশ্রুধারায় যেন যমুনার জলও দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এখানে যমুনার জল কেবল নদীর প্রবাহ নয়, বরং কৃষ্ণবিরহে ব্যথিত হৃদয়ের অশ্রুর প্রতীক।

    গানের পরবর্তী অংশে কৃষ্ণের রূপমাধুর্য ও তাঁর বিচ্ছেদের বেদনা একসঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। কৃষ্ণের শ্যামবর্ণ রূপকে কবি শীতল মেঘের সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেমন তৃষ্ণার্ত চাতক পাখি মেঘের জলের প্রত্যাশায় ব্যাকুল হয়ে থাকে, তেমনি কৃষ্ণপ্রেমে আকুল ব্রজনারীরাও তাঁর সান্নিধ্যের জন্য অধীর হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেই স্নিগ্ধ শীতল মেঘের মধ্যেই যেমন বজ্রপাতের সম্ভাবনা থাকে, তেমনি কৃষ্ণের মধুর প্রেমের মধ্যেও বিচ্ছেদের গভীর বেদনা লুকিয়ে আছে। ‘শীতল মেঘে অশনি থাকে’—এই চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি প্রেমের আনন্দ ও বিরহের যন্ত্রণা একই সঙ্গে প্রকাশ করেছেন।

    পরবর্তী অংশে কৃষ্ণবিহীন বৃন্দাবনের নিস্তব্ধ ও প্রাণহীন পরিবেশের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। কৃষ্ণের বাঁশির মধুর ধ্বনি আর শোনা যায় না, গোপালদের ধেনু চরানোর দৃশ্যও নেই, গোকুলের মাটিতে আর পড়ে না কৃষ্ণের চরণধূলি। যে বাঁশির সুর একদিন সমগ্র ব্রজকে আনন্দে মুখরিত করেছিল, আজ সেই বাঁশিই কৃষ্ণস্মৃতির একমাত্র স্মারক হয়ে রয়েছে। শ্রীদাম ও সুদাম কৃষ্ণের ফেলে যাওয়া বাঁশি নিয়ে মথুরার পথে ছুটে চলেছে এবং বন্ধুবিচ্ছেদের বেদনায় অশ্রুসিক্ত হয়েছে।

    গানের শেষাংশে কৃষ্ণদর্শনের আকাঙ্ক্ষা চরম রূপ লাভ করেছে। কৃষ্ণকে দেখতে না পেয়ে পাখিরাও যেন বৃন্দাবন ত্যাগ করে মথুরার দিকে উড়ে গেছে। ব্রজনারীরাও স্থির করেন—যেখানে কৃষ্ণ আছেন, সেই মথুরাতেই তাঁদের যেতে হবে। এখানে মথুরা কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি প্রিয়তম কৃষ্ণের সান্নিধ্য লাভের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪১) এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ১১ মাস।
     
  • গ্রন্থ:
    • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২) -এর ১৭৭ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৫৬।
    • নজরুল গীতি, অখণ্ড (আব্দুল আজীজ আল-আমান, সম্পাদিত)। [হরফ প্রকাশনী, মাঘ ১৪১০। জানুয়ারি ২০০৪]। ভক্তিগীতি। গান-১৫৩৭। পৃষ্ঠা: ৪০২।
  • রেকর্ড: টুইন [মে ১৯৩৪ (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪১)। এফটি ৩৩০০। শিল্পী সুধীরা সেনগুপ্ত]
  • স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
  • পর্যায়:

 

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।