নাচে নাচে রে মোর কালো মেয়ে (nache nache re mor kalo meye)

নাচে নাচে রে মোর কালো মেয়ে নৃত্যকালী শ্যামা নাচে।
নাচ হেরে তার নটরাজও প'ড়ে আছে পায়ের কাছে॥
মুক্তকেশী আদুল গায়ে
নেচে বেড়ায় চপল পায়ে
মা'র চরণে গ্রহতারা নূপুর হয়ে জড়িয়ে আছে॥
ছন্দ-সরস্বতী দোলে পুতুল হয়ে মায়ের কোলে রে
সৃষ্টি নাচে, নাচে প্রলয় মায়ের আমার পায়ের তলে রে।
আকাশ কাঁপে নাচের ঘোরে
ঢেউ খেলে যায় সাত সাগরে
সেই নাচনের পুলক জাগে ফুল হয়ে রে লতায় গাছে॥

  • ভাবসন্ধান: এই শ্যামাসংগীতে দেবী কালীর নৃত্যকালী রূপের মহাশক্তি, বিশ্বনিয়ন্ত্রণ এবং সৃষ্টিধর্মী শক্তির এক অনন্য চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। এখানে দেবী কালী কেবল সংহারের দেবী নন; তিনি সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয়, ছন্দ ও মহাজাগতিক শক্তির পরম আধার। তাঁর নৃত্যের মধ্য দিয়েই সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের গতি ও প্রাণস্পন্দন প্রকাশিত হয়েছে।

    গানের শুরুতে কবি দেবীকে স্নেহভরে 'মোর কালো মেয়ে' নামে সম্বোধন করেছেন। এই সম্বোধনে ভক্ত ও মাতৃসত্তার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক প্রকাশ পেয়েছে। একই সঙ্গে তিনি নৃত্যকালী রূপে নৃত্যরত। তাঁর নৃত্যের মহিমা এতই অপরিসীম যে নৃত্যের অধিপতি নটরাজ শিবও তাঁর পদপ্রান্তে শায়িত। এর দ্বারা দেবীর আদ্যাশক্তি ও সর্বোচ্চ মহিমা প্রকাশিত হয়েছে; শিবও শক্তি ছাড়া নিষ্ক্রিয়—এই শাক্তদর্শনের তত্ত্ব এখানে প্রতিফলিত।

    গানটির পরবর্তী অংশে দেবীর নানা রূপের বর্ণনা উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি মুক্তকেশী, উন্মুক্ত ও উদ্দাম ভঙ্গিতে নৃত্য করছেন। তাঁর চরণে গ্রহ-নক্ষত্র নূপুরের মতো জড়িয়ে আছে। অর্থাৎ সমগ্র মহাবিশ্ব তাঁর পদতলে নিয়ন্ত্রিত। গ্রহ-নক্ষত্রের গতি, সময়ের প্রবাহ এবং বিশ্বচক্র—সবই তাঁর ইচ্ছার অধীন। এখানে দেবীকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পরম নিয়ন্ত্রিণী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।

    এরপর কবি দেবীর নৃত্যের সৃষ্টিশীল দিকটি তুলে ধরেছেন। ছন্দ-সরস্বতী পুতুলের মতো তাঁর কোলে দোল খাচ্ছেন। অর্থাৎ জ্ঞান, সাহিত্য, সঙ্গীত ও শিল্পকলার উৎসও আদ্যাশক্তি। আবার সৃষ্টি ও প্রলয়—উভয়ই তাঁর পদতলে নৃত্য করে। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, জগতের জন্ম, বিকাশ ও বিনাশ—সবই দেবীর এক অনন্ত লীলার অংশ। তিনি একই সঙ্গে জীবনদাত্রী এবং প্রলয়কারিণী।

    শেষ স্তবকে দেবীর নৃত্যের বিশ্বব্যাপী প্রভাব চিত্রিত হয়েছে। তাঁর নৃত্যের ঘোরে আকাশ কেঁপে ওঠে, সাত সমুদ্রে ঢেউয়ের উচ্ছ্বাস জাগে এবং সেই আনন্দ-কম্পন লতা-গাছে ফুল হয়ে ফুটে ওঠে। অর্থাৎ দেবীর নৃত্য ধ্বংসের নয়, বরং সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রাণ, সৌন্দর্য, উচ্ছ্বাস ও নবজাগরণের উৎস। তাঁর শক্তিতেই প্রকৃতি চিরনবীন, চিরজীবন্ত।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।১৩৪১ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দ) গানটি গানের মালা গ্রন্থের  প্রথম সংস্করণে অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৫ বৎসর ৪ মাস।
     
  • গ্রন্থ: গানের মালা। প্রথম সংস্করণ আশ্বিন ১৩৪১ বঙ্গাব্দ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দ)। ৪৬। নটনারায়ণ-তেওড়া।
     
  • রেকর্ড: এইচএমভি। [নভেম্বর ১৯৩৪ (কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩৪১)। এন ৭৩০২। শিল্পী: মৃণালকান্তি ঘোষ। ভূপালী-দাদরা] [শ্রবণ নমুনা]
     
  • স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: সুধীন দাশ ও ব্রহ্মমোহন ঠাকুর। [নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, একাদশ খণ্ড (নজরুল ইনস্টিটিউট জুন ১৯৯৭)] ১৪ সংখ্যক গান  [নমুনা]
     
  • সুরকার: কাজী নজরুল ইসলাম।
     
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। শ্যামা। বন্দনা
    • সুরাঙ্গ: স্বকীয়
    • তাল: দাদরা
    • গ্রহস্বর: ণদা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।