নাচে শ্যাম সুন্দর গোপাল নটবর (nache shyam sundor gopal)
নাচে শ্যাম সুন্দর গোপাল নটবর
সুঠাম মনোহর মধুর ভঙ্গে
ঘিরি সে চরণ ঘুরিছে অগণন
গ্রহ-তারা গোপী সম রঙ্গে॥
হেরিয়া তাহারি নৃত্যের হিল্লোল
পবন উন্মান সাগরে জাগে দোল
সে নাচে বিবশ নিশীথ দিবস
জাগে হিল্লোল-আলো-আঁধার তরঙ্গে॥
সে নাচে বৃষ্টি হয় কোটি সৃষ্টি নির্ঝর সম ঝরে ছন্দ
সে নাচ হেরিয়া বন্ধন টুটে গো জাগে অনন্ত আনন্দ।
ষড় ঋতু ঘুরে' ঘুরে' হেরে সেই নৃত্য
প্রেমাবেশে মাতোয়ারা নিখিলের চিত্ত
তাই এ ত্রিভুবন হলো না রে পুরাতন
পেল চির-যৌবন নাচি' তারি' সঙ্গে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণের শ্যামসুন্দর, গোপাল ও নটবর রূপের মহাজাগতিক নৃত্যকে কেন্দ্র করে বিশ্বপ্রকৃতির চিরন্তন গতি, সৌন্দর্য, প্রেম ও নবজীবনের এক অপূর্ব রূপচিত্র অঙ্কিত হয়েছে। এখানে কৃষ্ণের নৃত্য কেবল বৃন্দাবনের রাসলীলার নৃত্য নয়; বরং সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রাণস্পন্দন ও চিরসৃজনশীল শক্তির প্রতীক।
গানের শুরুতে কবি শ্রীকৃষ্ণকে সুঠাম, মনোহর ও মধুর ভঙ্গিতে নৃত্যরত নটবর রূপে দেখিয়েছেন। তাঁর সেই নৃত্যের সঙ্গী হয়ে চারদিকে অসংখ্য গ্রহ ও নক্ষত্র গোপীদের মতো প্রেমমুগ্ধ হয়ে আবর্তিত হচ্ছে। এই চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, কৃষ্ণই বিশ্বজগতের কেন্দ্র, আর সমগ্র মহাবিশ্ব তাঁর প্রেমময় আকর্ষণে নিরন্তর গতিশীল। যেমন রাসলীলায় গোপীরা কৃষ্ণকে ঘিরে নৃত্য করেন, তেমনি গ্রহ-নক্ষত্রও যেন তাঁকে কেন্দ্র করেই অনন্ত ছন্দে পরিভ্রমণ করছে।
পরবর্তী অংশে উপস্থাপিত হয়েছে কৃষ্ণের নৃত্যের তরঙ্গে সমগ্র প্রকৃতির আন্দোলন। তাঁর নৃত্যের হিল্লোল দেখে পবন উন্মত্ত হয়ে ওঠে, সমুদ্রে দোল জাগে এবং দিন-রাত্রি, আলো-অন্ধকার সবই সেই নৃত্যের ছন্দে দুলতে থাকে। অর্থাৎ বিশ্বপ্রকৃতির প্রতিটি গতি, পরিবর্তন ও ছন্দ কৃষ্ণের মহালীলারই বহিঃপ্রকাশ।
এরপর কবি কৃষ্ণের নৃত্যকে সৃষ্টির উৎস হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর নৃত্যের প্রভাবে বৃষ্টি নেমে আসে, অসংখ্য সৃষ্টি নির্ঝরের মতো প্রবাহিত হয় এবং সর্বত্র ছন্দের জন্ম হয়। আবার সেই নৃত্য দর্শনে মানুষের সকল বন্ধন ভেঙে যায়, হৃদয়ে জেগে ওঠে অনন্ত আনন্দ। এখানে কৃষ্ণের নৃত্য মুক্তি, প্রেম ও আধ্যাত্মিক জাগরণের প্রতীক।
শেষ স্তবকে পাওয়া যায় কবির মুগ্ধতা মিশ্রিত সমাপনী অভিব্যক্তি। ষড়ঋতু পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হয়ে এই নৃত্যের সাক্ষী থাকে এবং সমগ্র বিশ্ব সেই প্রেমোচ্ছ্বাসে মুগ্ধ হয়ে ওঠে। তাই ত্রিভুবন কখনো পুরাতন হয় না; কৃষ্ণের নিত্যনবীন নৃত্যের সঙ্গে নৃত্য করতে করতেই বিশ্ব চিরযৌবন লাভ করে। অর্থাৎ সৃষ্টির নবীনতা, প্রকৃতির চিরসবুজ রূপ এবং জীবনের অবিরাম প্রাণশক্তির উৎস এই মহাজাগতিক নৃত্য।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে (পৌষ-মাঘ ১৩৪৩) টুইন রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির একটি রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৭ বৎসর ৭ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২]। গান সংখ্যা ২৪৪
- রেকর্ড। টুইন [জানুয়ারি ১৯৩৭ (পৌষ-মাঘ ১৩৪৩)। এফটি ৪৭৪৫। শিল্পী: ধরিত্রী মুখোপাধ্যায়] [শ্রবণ নমুনা]
এর জুড়ি গান-সে চ'লে গেছে ব'লে কি গো
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি: সুধীন দাশ ও ব্রহ্মমোহন ঠাকুর[নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, অষ্টম খণ্ড নজরুল ইন্সটিটিউট ১২ ভাদ্র, ১৩৯৯ বঙ্গাব্দ/ ২৭ আগষ্ট, ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দ। ১২ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৬৬-৬৮] [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। বন্দনা
- সুরাঙ্গ: ভজন
- তাল: কাহারবা
- গ্রহস্বর: র্সা