নিপীড়িতা পৃথিবী ডাকে (nipirita prithibi dake)
নিপীড়িতা পৃথিবী ডাকে
জাগো চণ্ডিকা মহাকালি।
মৃতের শ্মশানে নাচো মৃত্যুঞ্জয়ী মহাশক্তি
দনুজ-দলনী করালি॥
প্রাণহীন শবে শিব-শক্তি জাগাও
নারায়ণের যোগ-নিদ্রা ভাঙাও
অগ্নিশিখায় দশমিক রাঙাও
বরাভয়দায়িনী নৃমুণ্ডমালি॥
শ্রী চণ্ডিতে তোরই শ্রীমুখের বাণী
কলিতে আবির্ভাব হবে তোর ভবানী।
এসেছে কলি, কালিকা এলি কই
শম্ভু-নিশুম্ভ জন্মেছে পুন ঐ
অভয়বাণী তব মাভৈঃ মাভৈঃ
শুনিব কবে মাগো খর করতালি॥
- ভাবসন্ধান: কাজী নজরুল ইসলামের রচিত ‘দেবীস্তুতি’ গীতি-আলেখ্যের এই গানে দেবী মহাকালীকে জাগরণের, ন্যায়প্রতিষ্ঠার এবং অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীকরূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। কবি অনুভব করেছেন যে, পৃথিবী অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার ও অধর্মে জর্জরিত। তাই তিনি দেবী চণ্ডিকা-মহাকালীকে আহ্বান জানিয়েছেন, যেন তিনি তাঁর মহাশক্তির প্রকাশ ঘটিয়ে মানবসমাজকে মুক্তি ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করেন।
গানের শুরুতেই নিপীড়িত পৃথিবীকে উদ্ধারের জন্য দেবী চণ্ডিকারূপিণী দুর্গাকে আহ্বান করছে। তাঁর প্রার্থনা দেবী যেন মৃত্যুঞ্জয়ী মহাশক্তিরূপে আবির্ভূত হয়ে শ্মশানে তাণ্ডব নৃত্যে দানবীয় ও অশুভ শক্তিকে ধ্বংস করুন। এখানে ‘শ্মশান’ ধ্বংসের স্থান নয়; বরং পুরাতন, মৃত ও অকল্যাণকর শক্তির অবসান এবং নতুন শক্তি ও জীবনের সূচনার প্রতীক। ‘দনুজ-দলনী’ রূপে দেবী সকল অত্যাচারী, অসুরপ্রবৃত্তি ও অন্যায়ের বিনাশ সাধন করেন।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন, যেন তিনি প্রাণহীন মানুষ্যসত্তার মাঝে শৈবশক্তির জাগরণ ঘটান এবং যোগনিদ্রায় নিমগ্ন নারায়ণকে জাগিয়ে বিশ্বকল্যাণের কর্মধারা পুনরায় সচল করেন। ‘অগ্নিশিখায় দশদিক রাঙাও’—এই আহ্বানের মাধ্যমে কবি চান, দেবীর তেজ, শক্তি ও ন্যায়ের দীপ্তি সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ুক। আর বরাভয়দায়িনী নৃমুণ্ডমালিনী রূপে তিনি ভক্তদের সাহস, নির্ভয়তা ও আশ্রয় প্রদান করুন। এখানে শুধু নৃমুণ্ডমালাধারিণী দেবীর ধ্বংসের উল্লাস নয়। এটি অজ্ঞান, অহংকার ও অশুভ প্রবৃত্তির ওপর জ্ঞানের ও ন্যায়ের বিজয়ের প্রতীক।
এরপর কবি শ্রীশ্রীচণ্ডী-এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, সেখানে দেবী নিজেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, যখনই পৃথিবীতে অধর্ম ও অশুভ শক্তির প্রাবল্য বৃদ্ধি পাবে, তখনই তিনি আবির্ভূত হবেন। সেই বিশ্বাস থেকেই কবি প্রশ্ন করেন—কলিযুগ তো এসে গেছে, আবার শুম্ভ-নিশুম্ভের মতো অসুরপ্রবৃত্তিও পৃথিবীতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে; তবে দেবী এখনও কেন আবির্ভূত হচ্ছেন না? এখানে শুম্ভ-নিশুম্ভ কেবল পৌরাণিক অসুর নয়; বরং সমাজে ছড়িয়ে থাকা লোভ, অত্যাচার, হিংসা, অবিচার ও অমানবিকতার প্রতীক।
এই গানের শেষাংশে কবি দেবীর অভয়বাণীর জন্য ব্যাকুল আবেদন জানান। তিনি চান, দেবী তাঁর ‘মাভৈঃ, মাভৈঃ’ (ভয় করো না) আশ্বাসবাণী এবং বজ্রনিনাদের মতো করতালের ধ্বনিতে বিশ্ববাসীর অন্তরে সাহস, শক্তি ও সংগ্রামের চেতনা জাগিয়ে তুলুন। এই আহ্বান ধর্মীয় ভক্তির প্রকাশের মধ্য দিয়ে সত্য, ন্যায়, মানবমর্যাদা ও মুক্তির জন্য এক জাগরণী ডাক।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার ১৩ মাঘ ১৩৪৪), কলকাতা বেতার থেকে প্রচারিত 'দেবস্তুতি' আলেখ্যের সাথে এই গানটি প্রচারিত হয়েছিল। এই মাসেই এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৭ বৎসর ১১ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৯৮০।
- পত্রিকা: বেতার জগৎ [১৬ জানুয়ারি ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দ (রবিবার, ২ মাঘ ১৩৪৪)]। 'আমাদের কথা' বিভাগে।
[সূত্র: বেতার জগৎ। ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা। প্রচ্ছদ ও পৃষ্ঠা:৪৫।
- বেতার: দেবীস্তুতি
- প্রথম প্রচার। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। ২৭ জানুয়ারি ১৯৩৮ (বৃহস্পতিবার ১৩ মাঘ ১৩৪৪)। শিল্পী: গীতা মিত্র
[সূত্র:- বেতার জগৎ। ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা। প্রচ্ছদ ও পৃষ্ঠা:৪৫।
- The Indian listener. Vol III. No II, (7th January, 1938) Page 121
- দ্বিতীয় প্রচার। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। ২৫ জুলাই ১৯৩৯ (মঙ্গলবার, ৯ শ্রাবণ ১৩৪৬)।
[সূত্র: বেতার জগৎ-পত্রিকার ৯ম বর্ষ ১২শ সংখ্যা। পৃষ্ঠা ৫৩৩]
- প্রথম প্রচার। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। ২৭ জানুয়ারি ১৯৩৮ (বৃহস্পতিবার ১৩ মাঘ ১৩৪৪)। শিল্পী: গীতা মিত্র
- গ্রন্থ: দেবীস্তুতি। [নজরুল রচনাবলী জন্মশতবর্ষ সংকলন। অষ্টম খণ্ড (১২ ভাদ্র ১৩১৫, ২৭শে আগষ্ট ২০০৮)। বাংলা একাডেমী ঢাকা। চণ্ডিকা মহাকালী। পৃষ্ঠা: ২৫১]
- রেকর্ড: এইচএমভি [মার্চ ১৯৩৮ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪৪)। এফটি ১৭০৪৯। শিল্পী: বিজনবালা ঘোষ। সুর: বিজনবালা ঘোষ।
- পত্রিকা: ভারতবর্ষ। অগ্রহায়ণ ১৩৪৫। নভেম্বর-ডিসেম্বর ১৯৩৮। রাগ: পঞ্চম, তাল: ত্রিতাল। শিল্পী: বিজনবালা ঘোষ। সুরকার: বিজনবালা ঘোষ। [নমুনা]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
- বিজনবালা ঘোষ। ভারতবর্ষ। অগ্রহায়ণ ১৩৪৫। নভেম্বর-ডিসেম্বর ১৯৩৮। [নমুনা]
- নিতাই ঘটক। সঙ্গীতাঞ্জলি। দ্বিতীয় খণ্ড। দ্বিতীয় সংস্করণ। শ্যামাপূজা, ১৩৮৩। [নমুনা]
- সুধীন দাশ [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, আটাশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। আষাঢ়, ১৪১৩/জুলাই ২০০৬] ২০ সংখ্যক গান। [নমুনা]
- পর্যায়: