নিশি ও প্রভাতে মিলন লগন (nishi o probhate milon)

নিশি ও প্রভাতে মিলন লগন
জাগিল অরুণ তন্দ্রা মগন,
রাধামাধব মধুবাসরে অতি কাতর ঘুমে।
পাপিয়া কুহু ডাকিয়া কেন গো
সহসা থামিল কুঞ্জে যেন গো,
মেলিয়া আঁখি গিরিমল্লিকা কেন পড়িল ঝুমে॥
কেন চাহিতে গিয়ে ফুল চাহিতে পারে না,
গাইতে গিয়ে পাখি গাইতে পারে না,
যদি শ্যামের ঘুম ভাঙে গাইতে পারে না,
যদি ফুল ফোটা দেখে রাধা জেগে উঠে
ফুল ফুটিতে পারে না-
জটিলা কুটিলা সম কেন এলো ঊষা আর শুকতারা গো।
করুণ অরুণ আসিবে এখনি যেন আয়ানে পারা গো।
চাঁদের হাট এই বৃন্দাবনে কেন রবি উঠিতে চায়।
কোকিল, পাপিয়া, শুকসারী, ময়ূরের দেশে ব্যাধ কেন আসে হায়।
সে তীর কেন হানে গো,
যথা নিত্য থির আনন্দ, সেই বনে বিরহের তীর কেন হানে গো।
কেমনে ভাঙাব ঘুম ঘন শ্যাম কিশোরীর কেমনে করিব রসভঙ্গ সখি গো।

  • ভাবসন্ধান: কাজী নজরুল ইসলামের রচিত ‘অভিসার’ পালাকীর্তনের এই গানে শ্রীমতী রাধার কণ্ঠে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে মিলনের পর প্রভাতকালে বিচ্ছেদের আশঙ্কাজনিত গভীর প্রেম, উদ্বেগ ও বিরহবেদনা প্রকাশিত হয়েছে। বৈষ্ণব মাধুর্যরসের অনুপম চিত্রায়ণে কবি দেখিয়েছেন, রাধাকৃষ্ণের প্রেমমিলনের সেই অপার্থিব মুহূর্ত যেন কোনোভাবেই ভঙ্গ না হয়—এটাই রাধার একান্ত আকাঙ্ক্ষা।

    গানের শুরুতে কবি রাত্রি ও প্রভাতের সন্ধিক্ষণের এক অপূর্ব পরিবেশ নির্মাণ করেছেন। অরুণোদয়ের আভাস ফুটে উঠলেও রাধা ও মাধব তখনও প্রেমমিলনের মধুর ক্লান্তিতে গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন। চারপাশের প্রকৃতিও যেন সেই পবিত্র মিলনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছে। পাপিয়ার ডাক হঠাৎ থেমে যায়, গিরিমল্লিকা ফুলও যেন নীরবে ঝরে পড়ে। এর দ্বারা কবি বোঝাতে চেয়েছেন, প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানই রাধাকৃষ্ণের প্রেমের মাহাত্ম্যে মুগ্ধ ও নিবেদিত।

    গানটর পরবর্তী অংশে রাধা অনুভব করেন, প্রকৃতি নিজেও যেন তাঁদের নিদ্রা ভাঙাতে দ্বিধাগ্রস্ত। ফুল ফুটতে চেয়েও ফুটছে না, পাখি গান গাইতে চেয়েও গাইছে না—যদি সেই শব্দে শ্যামের ঘুম ভেঙে যায় এবং রাধারও জাগরণ ঘটে। এই চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি প্রেমমিলনের সেই ক্ষণস্থায়ী অথচ চিরন্তন সুখকে রক্ষা করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। এখানে প্রকৃতি যেন প্রেমিক-প্রেমিকার নীরব সহচরে পরিণত হয়েছে। এরপর রাধা প্রভাতের আগমনকে শঙ্কার চোখে দেখেন। তিনি অভিমানভরে প্রশ্ন করেন—ঊষা ও শুকতারা কেন এসে উপস্থিত হলো? কেন সূর্য উঠতে চায়, যখন বৃন্দাবন চাঁদের আলোয় পরিপূর্ণ? আবার কোকিল, পাপিয়া, শুক-সারী ও ময়ূরের আনন্দময় দেশে ব্যাধের আগমনের উপমা দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, প্রভাতের আবির্ভাব তাঁদের প্রেমমিলনের অবসান ঘটিয়ে বিরহের সূচনা করবে। এখানে ‘ব্যাধ’ বিচ্ছেদ ও নির্মম সময়ের প্রতীক, আর ‘বিরহের তীর’ প্রেমিক-প্রেমিকার হৃদয়ে বিচ্ছেদের যন্ত্রণার রূপক।

    গানের শেষাংশে রাধা সখীর কাছে তাঁর অসহায়তার কথা প্রকাশ করেন। তিনি ভাবেন, কীভাবে শ্যাম ও নিজের এই গভীর নিদ্রা ভাঙাবেন? কীভাবে এই অনুপম প্রেমরসের ভঙ্গ করবেন? তাঁদের প্রেম এখন ‘মহাভাব’-এ উন্নীত হয়েছে—যা বৈষ্ণব দর্শনে প্রেমের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক স্তর। সেই নিবিড় প্রেমমাধুর্যের মুহূর্তে সামান্য বিচ্ছেদের চিন্তাও তাঁর কাছে অসহনীয়। তাই রাধা চান, এই প্রেমময় মিলনের ক্ষণ যেন অনন্তকাল স্থায়ী হয়।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২) -এর ১৬২৯ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৪৮৭।
  • বেতার: অভিসার (পালা কীর্তন)। শ্রীরাধার গান। শিল্পী: শৈলদেবী। সুর: নজরুল]
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব।  রাধাকৃষ্ণ-লীলা

 

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।