নীরব সন্ধ্যা নীরব দেবতা খোলো মন্দির দ্বার (nirob sondha nirob debota kholo mondir daar)
নীরব সন্ধ্যা, নীরব দেবতা খোলো মন্দির দ্বার।
ম্লান হ’ল বেদনায় অঞ্জলি নিশি-গন্ধ্যার॥
নিভিয়া যায় হায় অঞ্চল-তলে
নয়নের প্রদীপ নয়নের জলে,
শুকাইল নিরাশায় চন্দন ফুলদল তোমার বরণ ডালার॥
মৌন র’বে আর কতকাল বল পাষাণ-বেদীতে,
কত জনম কত পূজারিণীর আয়ু-দীপ নিভাইতে।
দিনের তপস্যার শেষে সাঁজ-লগনে
আশার চাঁদ কি গো উঠিবে না গগনে,
আমার শেষ বাণী তোমার চরণে –
নিবেদনের ক্ষণ পাব নাকি আর॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে ভক্তের গভীর আর্তি, দীর্ঘ প্রতীক্ষা, নীরব সাধনা এবং আরাধ্য দেবতার করুণা লাভের আকাঙ্ক্ষা উদ্ভাসিত হয়েছে। এখানে সন্ধ্যার নিস্তব্ধ পরিবেশকে অবলম্বন করে কবি ভক্তের অন্তর্জগতের বেদনা, আশা-নিরাশার দ্বন্দ্ব এবং দেব-সান্নিধ্যের ব্যাকুল প্রত্যাশাকে অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
গানের শুরুতে কবি সন্ধ্যার নীরবতার সঙ্গে দেবতার নীরবতাকে একাত্ম করেছেন। তিনি নীরব দেবতার কাছে মন্দিরের দ্বার উন্মুক্ত করার আকুল আবেদন জানান। এখানে 'মন্দিরের দ্বার' কেবল ইট-পাথরের মন্দিরের দরজা নয়; এটি ঈশ্বরের করুণা, অনুগ্রহ ও সান্নিধ্য লাভের প্রবেশদ্বারের প্রতীক। ভক্তের হাতে নিবেদনের জন্য আনা নিশিগন্ধার অঞ্জলি বেদনায় ম্লান হয়ে গেছে, কারণ দীর্ঘ প্রতীক্ষাতেও তিনি এখনও দেবতার সাড়া পান নি।
গানৃইর পরবর্তী অংশে কবি ভক্তের হতাশা ও ব্যর্থতার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। তাঁর চোখের জলে নয়নের প্রদীপ নিভে যেতে বসেছে, আর নিরাশার দহনেই পূজার চন্দন ও ফুল শুকিয়ে গেছে। এখানে ;নয়নের প্রদীপ' ভক্তির আলো ও আশার প্রতীক, আর 'চন্দন-ফুল' নির্মল প্রেম, শ্রদ্ধা ও আত্মনিবেদনের প্রতীক। অর্থাৎ দীর্ঘ প্রতীক্ষা ভক্তের হৃদয়কে ক্লান্ত ও বিষণ্ন করে তুলেছে, তবুও তাঁর উপাসনা বন্ধ হয়ে যায় নি।
এরপর ভক্ত দেবতার নীরবতার কারণ জানতে চেয়ে প্রশ্ন করেন- আর কতকাল পাষাণবেদিতে তিনি নীরব হয়ে থাকবেন এবং আর কত পূজারিণীর জীবনপ্রদীপ এভাবে নিভে যাবে ব্যর্থতার গ্লানিতে। এখানে ‘পাষাণ-বেদী’ দেবতার অনড় ও নীরব অবস্থার প্রতীক, আর ‘আয়ু-দীপ’ মানুষের জীবন ও সাধনার রূপক। এই প্রশ্নে ভক্তের অভিমান থাকলেও তার অন্তরে বিশ্বাস ও ভক্তি অটুট রয়েছে।
গানের শেষাংশে কবি আশার আলোকে পুনরায় নিজেকে উজ্জীবিত করেছেন। সারা দিনের দীর্ঘ তপস্যার শেষে যেমন সন্ধ্যা আসে, তেমনি জীবনের কঠোর সাধনার পর কি আশার কি চাঁদ উদিত হবে- এটা দেবতার কাছে জিজ্ঞাসা হলে- ভক্তি তা আশার প্রত্যয় হিসেবেই ব্যক্ত করেছেন। সারাদিন তথা সারাজীবন ধরে তিনি আরধনা করে- জীবন সায়াহ্বে এসে পৌঁছে ভক্ত সংশয় চিত্তে অনুভব করেছেন, হয়তো এটাই তাঁর শেষ নিবেদন। তাই জীবনের শেষ বাণীটুকুও তিনি দেবতার চরণে অর্পণ করতে চান। তাঁর আকুল প্রশ্ন—তিনি কি আর একবার অন্তত সেই নিবেদনের পবিত্র মুহূর্ত লাভ করবেন? এই প্রার্থনায় ভক্তের আত্মসমর্পণ, বিনয় ও ঈশ্বরের কৃপা লাভের গভীর আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম থেকে নজরুল পুরোপুরি নির্বাক ও স্থবির হয়ে গিয়েছিলেন। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৫২ বৎসর।
[ নজরুলের ৫২ বৎসর অতিক্রান্ত বয়সের গানের তালিকা]
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৫২১। পৃষ্ঠা: ৪৫৬ ]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। দৈবসত্তা। প্রার্থনা