নীল হরি এসো নীলে হিরণে (nil hori esho nile hirone)

নীল হরি এসো নীলে হিরণে সেজে মন হরিতে
হে নীল হৃষিকেশ বিজড়িত হয়ে এসো
হিরণ বরণ রাই কিশোরীতে॥
চাঁচর কেশে নীল ময়ূর পাখা
অধরে সোনার হাসি জোছনা মাখা
সুনীল উদার বক্ষ ঢাকা কাঞ্চন কদম মঞ্জুরীতে॥

স্বর্ণ পাখা নীর প্রজাপতি সম
পীত বসন প’রে এসো নীল কিশোর মম।
নীলমণি এসো হলুদ চাঁপার বনে
কনক নূপুর পরি’ নীল চরণে
সোনার ভ্রমর ঘেরা নীর পদ্ম যেন
নব ঘন শ্যাম এসো, বিজড়িত হেম-তড়িতে॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে ভক্তকবি শ্রীকৃষ্ণকে নানা রূপে আবির্ভূত হওয়া আহ্বান করেছেন- নানা রূপকল্পের মাধ্যমে। এই গানে শ্রীকৃষ্ণের শ্যামসুন্দর রূপ, শ্রীরাধার স্বর্ণময় প্রেমমাধুর্য এবং রাধাকৃষ্ণের যুগল ঐক্যের আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য কাব্যিক চিত্রকল্পে প্রকাশিত হয়েছে। ভক্তের অন্তরের গভীর আকাঙ্ক্ষা—যেন সেই যুগলরূপ হৃদয়ে আবির্ভূত হয়ে প্রেম, সৌন্দর্য, আনন্দ ও ঈশ্বরচেতনার আলোয় জীবনকে পরিপূর্ণ করে তোলে।

    গানের শুরু তাঁকে আহ্বান করেছে নীল হরি অর্থাৎ নীল বর্ণবিভূষিত শ্রীকৃষ্ণকে। পরক্ষণেই তাঁকে দেখেতে চেয়েছেন নীল ও স্বর্ণ মনোমুগ্ধকর সমন্বিত বর্ণে। তিনি নীল হৃষিকেশকে (ইন্দ্রিয়সমূহের অধিপতি; ভগবান শ্রীকৃষ্ণের একটি উপাধি), হিরণবর্ণা রাই (রাধা)-কিশোরীর সঙ্গে বিজড়িত হয়ে, অর্থাৎ তাঁকে আলিঙ্গন করে বা তাঁর প্রেমে একাত্ম হয়ে আবির্ভূত হওয়ার আহ্বান করেছেন। এখানে নীল রং কৃষ্ণের অসীমতা, গভীরতা ও প্রেমমাধুর্যের প্রতীক; আর হিরণ্ময় বা সোনালি আভা রাধার প্রেম, ঐশ্বর্য, আনন্দ ও দিব্য জ্যোতির প্রতীক। এই দুই রঙের মিলনে রাধাকৃষ্ণের অবিচ্ছেদ্য যুগলসত্তার এক অপূর্ব রূপ প্রকাশিত হয়েছে।

    তাঁর চঞ্চল কেশে নীল ময়ূরপুচ্ছ, অধরে চন্দ্রালোক-স্নিগ্ধ সোনালি হাসি, আর প্রশস্ত নীল বক্ষ সোনালি কদমফুলের মঞ্জরীতে শোভিত—এই সব চিত্রকল্পে কৃষ্ণের রূপমাধুর্য এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য একাকার হয়ে গেছে। এখানে প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান যেন তাঁর অলঙ্কার এবং তাঁর সৌন্দর্যেরই প্রকাশ।

    গানটির পরবর্তী অংশে কবি কৃষ্ণের মনোহর আবরণ ও আভরণকে উপস্থাপন করেছেন অপরূ চিত্রকল্পের মাধ্যমে। তাঁর পীতবসন, কনক নূপুর, নীল চরণ এবং হলুদ চাঁপার বনের চিত্রের মাধ্যমে নীল ও সোনালির এক চিরন্তন সুষমা ফুটে উঠেছে। কৃষ্ণকে নীলমণির সঙ্গে এবং তাঁর চরণকে সোনার ভ্রমরবেষ্টিত নীল পদ্মের সঙ্গে তুলনা করে কবি তাঁর অতুলনীয় সৌন্দর্য ও দেবমাধুর্যকে প্রকাশ করেছেন। 'নব ঘন শ্যাম এসো, বিজড়িত হেম-তড়িতে;—এই আহ্বানে কৃষ্ণকে নবঘন মেঘের মতো শ্যামবর্ণ এবং বিদ্যুতের মতো স্বর্ণোজ্জ্বল রাধার প্রেমে আবিষ্ট যুগলরূপে কল্পনা করা হয়েছে। এখানে মেঘ ও বিদ্যুতের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রাধাকৃষ্ণের চিরন্তন প্রেমমিলনের প্রতীক।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।  
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৩০৬৫। পৃষ্ঠা: ৯৩৮ ]
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। রাধাকৃষ্ণ। যুগল রূপ-সৌন্দর্য

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।