নূরের দরিয়ায় সিনান করিয়া (nurer doriay sinan koriya)
নূরের দরিয়ায় সিনান করিয়া কে এলো মক্কায় আমিনার কোলে
ফাগুন-পূর্ণিমা-নিশীথে যেমন আস্মানের কোলে রাঙা চাঁদ দোলে॥
কে এলো কে এলো গাহে কোয়েলিয়া,
পাপিয়া বুল্বুল্ উঠিল মাতিয়া,
গ্রহতারা ঝুঁকে করিছে কুর্নিশ হুরপরী হেসে পড়িছে ঢ’লে॥
জিন্নাতের আজ খোলা দরওয়াজা পেয়ে
ফেরেশ্তা আম্বিয়া এসেছে ধেঁয়ে
তাহ্রীমা বেঁধে ঘোরে দরুদ গেয়ে
দুনিয়া টলমল্, খোদার আরশ টলে॥
এলো রে চির-চাওয়া এলো আখেরি নবী
সৈয়দে মক্কী মদনী আল্-আরবি,
নাজেল হয়ে সে যে ইয়াকুত-রাঙা ঠোঁটে
শাহ্দতের বাণী আধো আধো বোলে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শুভ জন্মমুহূর্তকে মহাজাগতিক আনন্দ, রহমত ও নূরের আবির্ভাব হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। কবি তাঁর জন্মকে এমন এক ঐশী ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যার আনন্দে কেবল মক্কাই নয়, সমগ্র সৃষ্টি, আকাশ-বাতাস, ফেরেশতা এবং স্বর্গলোক উল্লাসে উদ্বেল হয়ে ওঠে।
গানের শুরুতে নবীজির জন্মকে "নূরের দরিয়ায় সিনান করিয়া"- অর্থাৎ ঐশী জ্যোতির সাগরে স্নাত হয়ে পৃথিবীতে আগমনের রূপক দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁর মাতা আমিনা বিনতে ওহব-এর কোলে তাঁর আবির্ভাবকে ফাল্গুনী পূর্ণিমার রাতে আকাশে রাঙা চাঁদের উদয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এই উপমা নবীজির পবিত্রতা, সৌন্দর্য ও জগতকে আলোকিত করার মহিমাকে প্রকাশ করে।
গানের পরবর্তী অংশে কবি উপস্থাপন করেছেন- নবীজির জন্মে সমগ্র প্রকৃতি আনন্দে মুখর হয়ে ওঠার রূপচিত্র। কোকিল, পাপিয়া ও বুলবুলির গান, গ্রহ-নক্ষত্রের নত হয়ে কুর্নিশ করা এবং হুরপরীদের আনন্দোচ্ছ্বাস- এসব চিত্রকল্পের মাধ্যমে তাঁর জন্মের সর্বজনীন তাৎপর্য ও মহিমা তুলে ধরা হয়েছে। এখানে প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের প্রতিটি উপাদান যেন এই মহাপবিত্র আগমনের সাক্ষী ও আনন্দসঙ্গী।
এরপর স্বর্গীয় পরিবেশের বর্ণনায় বলা হয়েছে- জান্নাতের দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে, ফেরেশতা ও পূর্ববর্তী নবীগণ এই শুভক্ষণে সমবেত হয়েছেন এবং দরুদ পাঠে মুখরিত হয়েছেন। পৃথিবী থেকে আরশ পর্যন্ত আনন্দ ও রহমতের এমন প্রবল সঞ্চার হয়েছে যে, সমগ্র সৃষ্টি যেন আনন্দে আন্দোলিত হয়ে উঠেছে। এটি নবীজির আগমনের বিশ্বজনীন ও মহাজাগতিক গুরুত্বের কাব্যিক প্রকাশ।
গানের শেষাংশে কবি ঘোষণা করে বলেছেন-, বহু প্রতীক্ষিত আখেরি নবী- মক্কা ও মদিনার গৌরব, আরবের শ্রেষ্ঠ সন্তান- এই পৃথিবীতে আগমন করেছেন। তাঁর ইয়াকুতসম (মাণিক্য, রুবি) রক্তিম অধরে উচ্চারিত হতে শুরু করেছে শাহাদতের বাণী, যা পরবর্তীকালে মানবজাতির জন্য তাওহিদের চিরন্তন আহ্বান হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। শিশুকণ্ঠের সেই আধো-আধো উচ্চারণ ভবিষ্যতের বিশ্বমুক্তির বাণীরই প্রতীক।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪), এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি এই গানের একটি রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৭ বৎসর ১১ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ২৪৯।
- রেকর্ড: এইচএমভি [মে ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দ (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪)। এন. ৯৮৯৯। শিল্পী: আব্বাসউদ্দীন আহমদ ও মহম্মদ কাশেম। সুরকার: নজরুল ইসলাম] [শ্রবণ নমুনা]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: সুধীন দাশ। [নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, সপ্তম খণ্ড নজরুল ইন্সটিটিউট ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৯৯ বঙ্গাব্দ/ ২৫শে মে, ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দ। ১৩ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৭৩-৭৫] [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম ধর্ম। নাত-এ-রসুল
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল: কাহারবা
- গ্রহস্বর: ণা