পঞ্চ প্রাণের প্রদীপ-শিখায় লহ আমার শেষ আরতি (poncho praner prodip-shikhay loho amar shesh aroti)
পঞ্চ প্রাণের প্রদীপ-শিখায় লহ আমার শেষ আরতি।
ওগো আমার পরম-পতি, ওগো আমার পরম-পতি॥
বহু সে-কাল বাহির-দ্বারে
দাঁড়িয়ে আছি অন্ধকারে,
এবার দেহের দেউল ভেঙে দেখ্ব নিঠুর, তোমার জ্যোতি॥
আমি তোমায় চেয়েছিলাম, শুধু এই সে অপরাধে,
ধ্যান ভেঙেছ আমার, ফেলে নিত্য নূতন মায়ার ফাঁদে।
আজ মায়ার ঘরে আগুন জ্বেলে
পালিয়ে গেলাম পাখা মেলে,
জীবন যাহার মিথ্যা স্বপন মরণে তার নাই ক ক্ষতি॥
কেটে দিলাম নিঠুর হাতে যে বাঁধনে বেঁধেছিলে,
রইল না আর আমার ব’লে কোনো স্মৃতি এ-নিখিলে।
আবার যদি তোমার মায়ায়
রূপ নিতে হয় নূতন কায়ায়,
তোমার প্রকাশ রুদ্ধ যেথায় সেথায় যেন না হয় গতি॥
-
ভাবসন্ধান: এই গানে ভক্তের সাথে পরমসত্তার চিরমিলনের আকাঙ্ক্ষা, সংসারমায়া থেকে মুক্তিলাভ এবং আত্মসমর্পণের গভীর সাধনা উপস্থাপিত হয়েছে। এখানে ভক্ত জীবনের অন্তিম মুহূর্তকে পরমেশ্বরের উদ্দেশে নিবেদিত শেষ আরতিরূপে কল্পনা করেছেন। দেহ, প্রাণ, জীবন ও চেতনার সমস্ত শক্তি ঈশ্বরের চরণে উৎসর্গ করাই এই গানের মূল বিষয়।
গানের শুরুতে ভক্ত তাঁর আরাধ্য পরমসত্তাকে তাঁর পঞ্চ প্রাণের প্রদীপ-শিখায় তাঁর শেষ আরতি নিবেদন করেছেন। অর্থাৎ, ভক্ত চান তাঁর সমগ্র জীবনশক্তি, প্রাণস্পন্দন ও অস্তিত্ব যেন প্রদীপের শিখার মতো পরমসত্তার উদ্দেশে নিবেদিত হয়। তিনি পর্মসত্তাকে 'পরম-পতি” নামে সম্বোধন করেছেন, যা জীবাত্মা ও পরমাত্মার চিরন্তন সম্পর্কের প্রতীক। বহুদিন ধরে তিনি অজ্ঞতা ও মায়ার অন্ধকারে পর্মসত্তার দ্বারের বাইরে অপেক্ষা করেছেন; এখন তিনি দেহরূপী মন্দিরের সীমা অতিক্রম করে তাঁর অনন্ত জ্যোতির দর্শন কামনা করছেন।
গানের পরবর্তী অংশে ভক্তের আক্ষেপ প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর একমাত্র ছিল পরমসত্তাকে লাভ করার আকাঙ্ক্ষা। সে আকাঙক্ষা অপূর্ণ রয়েছে গেছে সংসারের নিত্যনতুন মায়া ও মোহের ফাঁদে। অভিমানী ভক্ত পরমসত্তার কাছে পরম আক্ষেপে বলেন- তাঁকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই কি ছিল তাঁর একমাত্র ‘অপরাধ’। ভক্ত তাঁর মোহের তাঁর ধ্যান ভঙ্গ করে, তিনি সেই মায়ার ঘরে আগুন জ্বালিয়ে বন্ধনমুক্ত পাখির মতো পরমসত্তার পথে যাত্রা করেন। এখানে মায়া হলো- সমস্ত আসক্তি, অহংকার ও জাগতিক মোহ। এখানে ‘মায়ার ঘরে আগুন’ জ্বালানো হলো অন্তরের আসক্তিকে সম্পূর্ণরূপে দহন করা। ভক্ত মনে করেন জাগতিক জীবন কেবল ক্ষণস্থায়ী স্বপ্ন, তাই মৃত্যু-ভয় তাঁর কাছে তুচ্ছ।
গানের শেষাংশে তিনি নিজের হাতে সেই সব বন্ধন ছিন্ন করা ঘোষণা দিয়েছেন। এতদিন যে মায়া তাঁকে আবদ্ধ রেখেছিল তা ত্যাগ করে বলেছেন- তাঁর নিজের বলে কিছু অবশিষ্ট নেই। যা কিছু আছে সবই পরমসত্তার। তবে তাঁর একটি প্রার্থনা রেখেছেন তাঁর আরাধ্য পরমসত্তার কাছে এই বলে— যদি কর্মফলের নিয়মে আবার নতুন দেহ ধারণ করে জন্মগ্রহণ করতে হয়- তবে যেন এমন স্থানে জন্ম না হয়, যেখানে পর্মসত্তার প্রকাশ রুদ্ধ, তথা সত্যের প্রকাশের পথ রুদ্ধ।
টীকা:
পঞ্চপ্রাণ: হিন্দু দর্শন, বিশেষত উপনিষদ, যোগশাস্ত্র ও বেদান্তে বলা হয় যে, জীবদেহে প্রধান প্রাণশক্তি পাঁচটি প্রধান রূপে ক্রিয়াশীল। এগুলোকে বলা পঞ্চপ্রাণ বলা হয়। এগুলো হলো--
১. প্রাণ — শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদ্ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
২. অপান — নিষ্কাশন, প্রজনন ও নিম্নমুখী ক্রিয়ার নিয়ন্ত্রক।
৩. সমান — হজম, পরিপাক ও দেহের ভারসাম্য রক্ষা করে।
৪. উদান — বাক্শক্তি, চেতনার ঊর্ধ্বগতি এবং মৃত্যুকালে প্রাণের উৎক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
৫. ব্যান — সমগ্র দেহে প্রাণশক্তির সঞ্চালন ঘটায়।
-
-
রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৩৫৯ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ (২৫মে ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দ), গানটি বুলবুল দ্বিতীয় খণ্ড অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রকাশিকা হিসেবে নাম ছিল- মিসেস প্রমীলা নজরুল।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৫২৫। পৃষ্ঠা: ৪৫৮]
- বুলবুল দ্বিতীয় খণ্ড
- প্রথম সংস্করণ [১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩৫৯ বঙ্গাব্দের (রবিবার ২৫ মে, ১৯৫২)। ]
- নজরুল-রচনাবলী─ষষ্ঠ খণ্ড [নজরুল জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। বাংলা একাডেমী, ১২ই ভাদ্র ১৪১৪। ২৭শে আগস্ট, ২০
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সাধারণ। পরমসত্তা। প্রার্থনা