মণি-মঞ্জির বাজে অরুণিত চরণে সখি (moni monjir baje orunito)
মণি-মঞ্জির বাজে অরুণিত চরণে সখি
রুনু ঝুনু রুনু ঝুনু মণি-মঞ্জির বাজে।
হের গুঞ্জা-মালা গলে বনমালী চলিছে কুঞ্জ মাঝে॥
চলে নওল কিশোর,
হেলে দুলে চলে নওল কিশোর।
হেরি সে লাবনি কৌস্তুভমণি নিষ্প্রভ হ’ল লাজে॥
চরণ-নখরে শ্যামের আমার চাঁদের মালা বিরাজে॥ সখি গো —
বঁধূর চলার পথে পরান পাতিয়া র’ব চলিতে দলিয়া যাবে শ্যাম;
আমি হইয়া পথের ধূলি বক্ষে লইব তুলি’ চরণ-চিহ্ন অভিরাম।
ভুলে যা তোরা রাধারে কৃষ্ণ-নিশির আঁধারে
হারায়ে সে গেছে চিরতরে,
কালো যমুনার জলে ডুবেছে সে অতল তলে
ভেসে গেছে সে শ্যাম-সাগরে॥
ঐ বাঁশি বাজিছে শোন রাধা ব’লে,
তরুণ তমাল চলে, অঙ্গ-ভঙ্গে শিখি-পাখা টলে।
তা’র হাসিতে বিজলি, কাজল-মেঘে যেন উঠিছে উছলি’।
রূপ দেখে যা দেখে যা,
কোটি চাঁদের জোছনা-চন্দন মেখে যা, মোর শ্যামলে দেখে যা॥
- ভাবসন্ধান: কৃষ্ণের প্রতি রাধার একান্ত, নিঃস্বার্থ ও আত্মবিসর্জনময় প্রেম। কৃষ্ণের রূপ ও বাঁশির মোহে রাধা নিজের অস্তিত্ব ভুলে গেছেন। তাঁর কাছে কৃষ্ণই জীবনের একমাত্র সত্য; কৃষ্ণের চরণধূলি লাভ করাই পরম সৌভাগ্য। তাই সমগ্র পদে মধুর রস, প্রেম, বিরহ, আত্মসমর্পণ ও কৃষ্ণের অপরূপ সৌন্দর্যের বন্দনা একাকার হয়ে গেছে। এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে শ্রীকৃষ্ণের অপরূপ রূপ, তাঁর নৃত্যগতি ও বাঁশির মোহে রাধার গভীর প্রেমোন্মাদনা উপস্থাপিত পেয়েছে। এখানে রাধা যেন সখীদের উদ্দেশে কৃষ্ণের সৌন্দর্যের কথা বলতে বলতে নিজেই প্রেমের আবেশে আত্মহারা হয়ে পড়েছেন।
গানের শুরুতে কৃষ্ণের আগমনের দৃশ্যটি অত্যন্ত মাধুর্যময়ভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর অরুণ পদযুগলে মণি-মঞ্জিরের “রুনু ঝুনু” ধ্বনি উঠছে। গলায় গুঞ্জামালা, তিনি বনমালীর বেশে কুঞ্জবনে চলেছেন। তাঁর “নওল কিশোর” রূপের লাবণ্যে এমন দীপ্তি যে, তাঁর বুকে থাকা কৌস্তুভমণিও যেন লজ্জায় নিষ্প্রভ হয়ে যায়। তাঁর পায়ের নখের জ্যোতিতে চাঁদের মালাও ম্লান বলে মনে হয়। অর্থাৎ, কৃষ্ণের সৌন্দর্যকে কবি জাগতিক সৌন্দর্যের সমস্ত মাপকাঠির ঊর্ধ্বে স্থাপন করেছেন।
এরপর রাধার প্রেম আরও গভীর ও আত্মবিস্মৃত রূপ লাভ করে। কৃষ্ণ যে পথে চলবেন, সেই পথেই রাধা আবেগের আতিশয্যে নিজের পরাণ বিছিয়ে দিতে চান। কৃষ্ণ যদি সেই পথ দিয়ে তাঁকে দলিত করে চলে যান, তবুও তিনি নিজেকে পথের ধূলির মতো করে কৃষ্ণের চরণচিহ্ন বুকে তুলে নিতে চান। এখানে প্রেমের চরম আত্মসমর্পণ ও বিরহব্যাকুলতা প্রকাশ পেয়েছে।
রাধা সখীদের বলেন, তাঁকে ভুলে যেতে—কারণ কৃষ্ণ-বিরহের নিশীথ-আঁধারে তিনি যেন হারিয়ে গেছেন। কালো যমুনার জলে ডুবে শ্যাম-সাগরে বিলীন হয়ে যাওয়ার উপমার মাধ্যমে তাঁর কৃষ্ণপ্রেমে সম্পূর্ণ আত্মবিসর্জনের ভাবটি প্রকাশিত হয়েছে। এটি কেবল বিরহ নয়; নিজের সত্তাকে কৃষ্ণের মধ্যে বিলীন করে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
গানের শেষাংশে কৃষ্ণের বাঁশির সুরে আবার রাধার হৃদয় আলোড়িত হয়। বাঁশিতে যেন 'রাধা' নামেরই আহ্বান ধ্বনিত হচ্ছে। কৃষ্ণের চলনে তরুণ তমালের দোল, অঙ্গভঙ্গে ময়ূরের পেখমের আন্দোলন, হাসিতে বিদ্যুতের ঝলক এবং কাজল-মেঘের মতো শ্যামবর্ণ রূপ—সব মিলিয়ে কৃষ্ণ এখানে প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি (মাঘ-ফাল্গুন ১৩৪০) মাসে মেগাফোন কোম্পানি থেকে এই গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ৭-৮ মাস।
- রেকর্ড: মেগাফোন। ফেব্রুয়ারি ১৯৩৪ (মাঘ-ফাল্গুন ১৩৪০)। নম্বর জেএনজি ৯৮। শিল্পী: আভা সরকার। [শ্রবণ নমুনা]
- গ্রন্থ:
- গীতি-শতদল প্রথম সংস্করণ [বৈশাখ ১৩৪১। এপ্রিল ১৯৩৪। বেহাগ মিশ্র-কার্ফা]। [গীতি-শতদল-৭২]
- নজরুল রচনাবলী, পঞ্চম খণ্ড [বাংলা একাডেমী। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১ । গীতি-শতদল। গান সংখ্যা ৭২। কীর্তন। পৃষ্ঠা ৩২৩-৩২৪]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইন্সটিটিউট, মাঘ, ১৪১৭/ফেব্রুয়ারি, ২০১৪)। গান সংখ্যা ২০৫৫।
- বেতার: রূপানুরাগ। পালা-কীর্তন। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি (১০ ফাল্গুন ১৩৪৭), কলকাতা-ক এর তৃতীয় অধিবেশনে রাত ৮ টা থেকে ৮.৩৯টা পর্যন্ত প্রচারিত হয়েছিল।
- সূত্র: বেতার জগৎ। ১২শ বর্ষ ৪র্থ সংখ্যার [পৃষ্ঠা ১৭২, ২১০]
- সূত্র: বেতার জগৎ। ১২শ বর্ষ ৪র্থ সংখ্যার [পৃষ্ঠা ১৭২, ২১০]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: সুধীন দাশ [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, আটাশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। আষাঢ়, ১৪১৩/জুলাই ২০০৬] ২২ সংখ্যক গান। [নমুনা]
- পর্যায়: