প্রিয়তম হে, আমি যে তোমারি চির-আরাধিকা (priyotomo hey ami je tomari)

প্রিয়তম হে, আমি যে তোমারি চির-আরাধিকা।
তব নাম গেয়ে প্রেম-বৃন্দবনে ফিরি ব্রজ-বালিকা॥
মম নয়ন দুটি তব দেবালয়ে
জ্বলে নিশিদিন আরতি-প্রদীপ হয়ে
নাম-কলঙ্ক তব হরি-চন্দন মোর গলার মালিকা॥
মোরে শরণ দাও তব চরণে কর অবনমিতা,
জনমে জনমে হয়ো প্রভু তুমি, আমি হব দয়িতা।
শুধু নাম শুনি, নাথ মনে মনে
আমি স্বয়ম্বরা হয়েছি গোপনে,
বড় সাধ প্রাণে র’ব তোমারি ধ্যানে হব শ্যাম-সাধিকা॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে ভক্তের একনিষ্ঠ কৃষ্ণপ্রেম, আত্মসমর্পণ, সামাজিক নিন্দাকে উপেক্ষা করে ঈশ্বরপ্রেমে অবিচল থাকার মনোভাব এবং জন্মে জন্মে শ্রীকৃষ্ণের সান্নিধ্য লাভের আকাঙ্ক্ষা কাব্যিক ও রূপকধর্মী ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। এখানে ব্রজবালিকার প্রেম আসলে জীবাত্মার পরমাত্মার প্রতি চিরন্তন ভক্তি ও প্রেমের প্রতীক।

    এই গানে এক প্রেমময় ভক্ত আত্মাকে ব্রজবালিকার রূপে কল্পনা করে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি তার একান্ত প্রেম, আত্মসমর্পণ এবং চিরন্তন মিলনের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করা হয়েছে। এখানে পার্থিব প্রেম ও আধ্যাত্মিক ভক্তি একাকার হয়ে গেছে। কবি ভক্তের হয়ে নিজেকে শ্রীকৃষ্ণের 'চির-আরাধিকা' বলে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, তাঁর জীবনের একমাত্র সাধনা প্রভুর আরাধনা। তাই তিনি যেন ব্রজের গোপীদের মতো প্রেমের বৃন্দাবনে কৃষ্ণনাম গেয়ে বেড়ান। এই কল্পচিত্রের মধ্য দিয়ে ভক্তের আত্মপরিচয় ব্রজবালিকার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়।

    গানটির পরবর্তী অংশে কবি রূপকাশ্রয়ে তাঁর অন্তরের ভক্তিভাব উপস্থাপন করেছেন। তিনি মনে করেন, তাঁর দুটি নয়ন যেন প্রভুর মন্দিরে আলোক-প্রদায়িনী আরতির প্রদীপ। অর্থাৎ তাঁর দৃষ্টি সর্বদা প্রভুর দিকে নিবদ্ধ, তাঁর চোখে নিরন্তর ভক্তির আলো জ্বলে। সমাজ যদি এই প্রেমের জন্য তাঁকে কলঙ্কিতও করে, তবে সেই নাম-কলঙ্ক তাঁর কাছে হরিচন্দনের মতোই পবিত্র ও সুগন্ধময় অলংকার। মানুষের নিন্দা তাঁর কাছে লজ্জার নয়, বরং কৃষ্ণপ্রেমেরই গৌরবচিহ্ন। এরপর ভক্ত কৃষ্ণের চরণে আশ্রয় প্রার্থনা করে বিনীতভাবে নিবেদন করেন—জন্মে জন্মে যেন তিনি তাঁর আরাধ্য থাকেন, আর তিনি প্রভুর অনুগতা প্রেমিকা ও ভক্ত হয়ে থাকতে পারেন। এখানে ‘দয়িতা’ শব্দটি পার্থিব দাম্পত্যের ইঙ্গিত বহন করলেও মূলত এটি ভক্তের সাথে কৃষ্ণের চিরন্তন প্রেমময় মিলনের প্রতীক।

    গানের শেষাংশে কবি বলেন, তিনি কেবল প্রভুর নাম শুনেই মনে মনে তাঁকে স্বামীরূপে বরণ করেছেন। প্রকাশ্যে নয়, অন্তরের নিভৃত মন্দিরে তিনি এই আত্মিক স্বয়ংবর সম্পন্ন করেছেন। তাঁর একমাত্র আকাঙ্ক্ষা, সারাজীবন শ্রীকৃষ্ণের ধ্যানেই নিমগ্ন থেকে একজন সত্যিকারের শ্যাম-সাধিকা হয়ে ওঠা।  

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ১২ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার ২৬ অগ্রহায়ণ ১৩৪২) এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানির সাথে নজরুলের গান রেকর্ডের বিষয় চুক্তি হয়েছিল। এই চুক্তিতে এই গানটি ছিল। পরে গানটি প্রকাশিত হয় নি। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩৬ বৎসর ৫ মাস।
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২ খ্রিষ্টাব্দ। ১৯৯৯ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৬০১।
  • রেকর্ড:
    • এইচএমভি'র সাথে নজরুলে চুক্তি [১২ ডিসেম্বর ১৯৩৫  (বৃহস্পতিবার ২৬ অগ্রহায়ণ ১৩৪২)।
    • টুইন [জানুয়ারি ১৯৩৬ (পৌষ-মাঘ ১৩৪২)। এফটি ৪২১৪। শিল্পী: নিশারাণী গুপ্ত]
       
  • স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ:ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। আত্মনিবেদন
    • সুরাঙ্গ: ভজন
    • তাল:  কাহারবা
    • গ্রহস্বর: মদ

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।