প্রেমের প্রভু ফিরে এসো (premer probhu fire esho)

প্রেমের প্রভু ফিরে এসো, শিখাও আবার ক্ষমা।
ধূলির ধরায় আবার বহু পাপ হয়েছে জমা॥
ভোগবতীর ফেনিল জলে ডুবল ধরা অতল তলে,
ভরল বিশ্ব হলাহলে ঘিরল নিশীথ অমা॥
শিশুর মত অবোধ এরা খেলনা নিয়ে তাই,
নিত্য করে হানাহানি, ভাইকে মারে ভাই।
তোমার ত্যাগের মন্ত্র দিয়ে আবার এদের যাও বাঁচিয়ে
ভোগক্লান্ত ধরা (প্রভু, রণক্লান্ত ধরা) আবার হউক বিশ্বরমা॥

  • ভাবসন্ধান:  এই গানে প্রেমহীন, স্বার্থপর ও হিংসাপূর্ণ জগতসংসারে পরমকরুণাময় পরমসত্তার কাছে এক আন্তরিক প্রার্থনা নিবেদিত হয়েছে—তাঁর অপার করুণায় যেন প্রেম, ক্ষমা ও ত্যাগের চিরন্তন আদর্শে মানবজাতি পুনর্জাগরণের প্রেরণা লাভ করে এবং মানবসমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিকতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটে।

    গানের শুরুতেই কবি প্রেমের প্রভুর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন—তিনি যেন পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে এসে মানুষকে প্রেম, ক্ষমা ও দয়ার শিক্ষা দেন। কারণ এই পৃথিবীতে পাপ, অন্যায়, স্বার্থপরতা ও নিষ্ঠুরতা এমনভাবে সঞ্চিত হয়েছে যে মানবসমাজ তার নৈতিক ভিত্তি হারাতে বসেছে। এখানে ‘ধূলির ধরা’ বলতে এই মর্ত্যজগৎকে এবং ‘পাপের জমা’ বলতে মানুষের ক্রমবর্ধমান অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বোঝানো হয়েছে।

    গানের পরবর্তী অংশে ‘ভোগবতীর ফেনিল জলে’ এবং ‘হলাহল’ রূপকের মাধ্যমে সীমাহীন ভোগলালসা, লোভ ও বস্তুবাদী আসক্তির ভয়াবহ পরিণতি চিত্রিত হয়েছে। মানুষ ভোগের মোহে এমনভাবে নিমজ্জিত হয়েছে যে পৃথিবী যেন অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে। ‘হলাহল’ এখানে বিষের প্রতীক; অর্থাৎ লোভ, ঘৃণা, হিংসা ও অনৈতিকতা সমগ্র বিশ্বকে বিষাক্ত করে তুলেছে। আর ‘নিশীথ অমা’ মানবতার ওপর নেমে আসা গভীর অন্ধকার, হতাশা ও নৈতিক সংকটের প্রতীক।

    এরপর কবি মানুষের অপরিণত মানসিকতার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। অবোধ মানুষ সামান্য স্বার্থ, ক্ষমতা কিংবা সম্পদের মোহে শিশুর মতো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এর ফলে ভাই ভাইকে হত্যা করছে, মানবিক সম্পর্ক ছিন্ন হচ্ছে এবং বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, হিংসা ও বিভেদের আগুন ছড়িয়ে পড়ছে।

    গানের শেষাংশে কবি প্রেমের প্রভুর কাছে প্রার্থনা করেছেন—তিনি যেন তাঁর ত্যাগ, প্রেম, ক্ষমা ও আত্মোৎসর্গের মহান আদর্শে মানবজাতিকে পুনরায় উদ্বুদ্ধ করেন। ভোগ-বিলাসে ক্লান্ত কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবী আবার যেন শান্তি, সৌহার্দ্য, মৈত্রী ও কল্যাণের আবাসভূমিতে পরিণত হয়। ‘বিশ্বরমা’ বলতে এমন এক বিশ্বব্যবস্থাকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে প্রেম, শান্তি, ন্যায়, সম্প্রীতি ও মানবিকতার প্রতিষ্ঠা ঘটবে।

  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। গানটি পাওয়া যায় নজরুলের হারানো গানের খাতায় সংগৃহীত পাণ্ডুলিপিতে।
     
  • গ্রন্থ:
    • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ,[নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২। সংখ্যা ২০০৬। পৃষ্ঠা: ৬০২]
    • নজরুলের হারানো গানের খাতা [নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা। আষাঢ় ১৪০৪/জুন ১৯৯৭। গান সংখ্যা ১৩৫। for Kumari Sabita Roy লিখে কেটে দেওয়া হয়েছে। HMV । ভজন। পৃষ্ঠা: ১৬২।]
  • পর্যায়
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সাধারণ। পরমসত্তা। প্রার্থনা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।