ফিরে যা সখি ফিরে যা ঘরে (fire ja sokhi fire ja ghore)
ফিরে যা সখি ফিরে যা ঘরে
থাকিতে দে লো এ পথে পড়ে
যে পথ ধরে গিয়াছে হরি চলি’
আমি যাব না আর গোকূলে,
সখি শিশিরে আর ভয় কি করি ভেসেছি যবে অকূলে
সখি দিসনে লো দিসনে লো রাখ গোপী-চন্দন,
চন্দনে জুড়ায় না প্রাণের ক্রন্দন।
দ্বিগুণ বাজায় জ্বালা নব মালতী-মালা,
ও যে মালা নয়, মনে হয় সাপিনীর বন্ধন॥
সখি যাহার লাগিয়া বসন ভূষণ, সেই গেল যদি চলে
কি হবে এ ছার ভূষণের ভার ফেলে দে যমুনা-জলে।
সকলের মায়া কাটায়েছি সখি, টুটিয়াছে সব বন্ধন,
যেতে দে আমায়, যথা মথুরায় বিহরে নন্দ-নন্দন॥
দেখব তারে, রাজার সাজে দেখব তারে
রাজার সাজে কেমন মানায় গো-রাখা রাখাল-রাজে।
- ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণের মথুরায় প্রস্থান-পরবর্তী এক গোপীর গভীর বিরহ, বৈরাগ্য ও আত্মসমর্পণের অনুভূতি উপস্থাপিত হয়েছে। কৃষ্ণ-বিচ্ছেদে তাঁর হৃদয় এতটাই বিদীর্ণ যে, বৃন্দাবনের পরিচিত পরিবেশ, সখীদের সঙ্গ কিংবা অলংকার—কোনো কিছুই আর তাঁর কাছে অর্থবহ নয়। বৈষ্ণব পদাবলির বিপ্রলম্ভ-শৃঙ্গার (বিরহরস)-এর এক মর্মস্পর্শী প্রকাশ এই গান। গানের শুরুতেই গোপী তাঁর সখীকে বলেন, 'ফিরে যা সখি, ফিরে যা ঘরে'। তিনি নিজে আর ঘরে ফিরতে চান না; বরং সেই পথেই পড়ে থাকতে চান, যে পথে কৃষ্ণ বৃন্দাবন ছেড়ে মথুরায় গিয়েছেন। এই পথ তাঁর কাছে কৃষ্ণের স্মৃতিবিজড়িত, তাই সেই পথই যেন তাঁর সাধনার স্থান। তিনি আর গোকুলে ফিরে যেতে চান না, কারণ কৃষ্ণহীন গোকুল তাঁর কাছে অর্থহীন। তিনি বলেন, যিনি জীবনের মহাসমুদ্রে দুঃখের অকূলে ভেসে গেছেন, তাঁর কাছে শিশিরভেজা পথের কষ্ট আর কোনো কষ্টই নয়। এখানে ‘শিশির’ সামান্য দুঃখের প্রতীক, আর ‘অকূল’ অসীম বিরহবেদনার প্রতীক।
গানটির পরবর্তী অংশে সখীরা তাঁকে গোপী-চন্দন ও মালতীর মালা পরিয়ে সান্ত্বনা দিতে চান। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর মতে, চন্দনের শীতলতা বাহ্যিক দেহকে শীতল করতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের বিরহ-যন্ত্রণা দূর করতে পারে না। বরং নতুন মালতীর মালা তাঁর বেদনা আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই সেই মালা তাঁর কাছে ফুলের মালা নয়, বিষধর সাপের বন্ধনের মতো মনে হয়। এই উপমার মাধ্যমে কবি দেখিয়েছেন, প্রিয়জনের অনুপস্থিতিতে আনন্দের উপকরণও কীভাবে যন্ত্রণার কারণ হয়ে ওঠে।
এরপর গোপী বলেন, যাঁর জন্য তিনি এতদিন বসন-ভূষণ ধারণ করেছেন, সেই কৃষ্ণই যখন চলে গেছেন, তখন এই অলংকারের আর কোনো মূল্য নেই। তাই তিনি সব অলংকার যমুনার জলে বিসর্জন দিতে চান। এখানে বসন ও অলংকার পার্থিব সাজসজ্জা ও সংসারমোহের প্রতীক। কৃষ্ণবিরহে তিনি সমস্ত জাগতিক আসক্তি ত্যাগ করেছেন; তাঁর সব বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেছে। এখন তাঁর একমাত্র আকাঙ্ক্ষা কৃষ্ণের সান্নিধ্য লাভ।
গানটির শেষাংশে গোপী জানান, তিনি মথুরায় গিয়ে কৃষ্ণকে একবার দেখবেন। তবে সেই কৃষ্ণ আর বৃন্দাবনের সরল রাখাল নয়; তিনি এখন রাজবেশধারী। তাই তাঁর মনে কৌতূহল জাগে—রাজমুকুট ও রাজপোশাকে সেই গো-রাখা রাখাল-রাজকে কেমন দেখায়? এই প্রশ্নের মধ্যে যেমন কৌতূহল রয়েছে, তেমনি রয়েছে গভীর অভিমান ও স্মৃতিবেদনা। গোপীর কাছে কৃষ্ণের প্রকৃত পরিচয় রাজা নয়; তিনি চিরদিনের সেই বাঁশিবাদক রাখাল, যাঁর প্রেমে ব্রজভূমি একদিন মুখর ছিল।
সমগ্র গানে কাজী নজরুল ইসলাম বৈষ্ণব সাহিত্যের চিরন্তন বিরহভাবকে অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় রূপ দিয়েছেন। এখানে গোপীর ব্যক্তিগত বেদনা কেবল প্রেমিকার বেদনা নয়; এটি ভক্তের কৃষ্ণবিরহেরও প্রতীক। কৃষ্ণের অনুপস্থিতিতে তাঁর কাছে পৃথিবীর সমস্ত সুখ, সৌন্দর্য ও অলংকার অর্থহীন হয়ে পড়েছে। তাঁর একমাত্র সাধনা—যে পথ ধরে কৃষ্ণ চলে গেছেন, সেই পথ অনুসরণ করে তাঁর দর্শন লাভ করা। এভাবেই গানটি মানবপ্রেম ও ঈশ্বরপ্রেমকে একাত্ম করে বিরহকে ভক্তির সর্বোচ্চ রূপে উন্নীত করেছে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। গানটি গীতি-শতদল সঙ্গীত সঙ্কলনের প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৪১ বঙ্গাব্দের বৈশাখ (এপ্রিল ১৯৩৪) মাসে। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ১১ মাস।
- গ্রন্থ:
- গীতি-শতদল
- প্রথম সংস্করণ [বৈশাখ ১৩৪১। এপ্রিল ১৯৩৪। কীর্তন]
- নজরুল রচনাবলী, পঞ্চম খণ্ড [বাংলা একাডেমী। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১। গীতি-শতদল। গান সংখ্যা ৭৩। কীর্তন। পৃষ্ঠা ৩২৪-৩২৫]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ২০১১। পৃষ্ঠা: ৬০৪]
- গীতি-শতদল
- রেকর্ড: মেগাফোন [জুন ১৯৩৪ (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪১)]। জেএনজি ১২০।শিল্পী প্রতিভা সেন।
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: সেলিনা হোসেন [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, তেতাল্লিশতম খণ্ড, আষাঢ় ১৪২৫] গান সংখ্যা ১৫। পৃষ্ঠা: ৬৯-৭২ [নমুনা]
- পর্যায়: