ফোটে কমল কেমন করে (fote komol kemon kore)
ফোটে কমল কেমন করে, দেখিতে নিশি ভোরে, আসিনু কমল-বনে।
ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি কোথা হতে আসি গো, হুল ফোটায় অকারণে?
(কেন হুল ফোটায় গো, ফুল ফোটানো স্বভাব ছেড়ে, হুল ফোটায় গো?)
রসভরা শর্বরী বিরস কলহ করি’ ফুরাল।
চাঁদের হাটে এসে, অমৃতের রাধার কাছে, করিনু ভুল কি?
ফাগুনের ফুল ভেবে, পরশ করিনু, বুঝি আগুনের ফুলকি!
[ফাগুনের ফুল (রাগে আগুন হয়েছে গো)]
রাধার প্রেমের মহাভাবে সমাধি হইল পথে –
পাষাণ বিগ্রহ ভেবে, (দলে দলে) নারী এলো কোথা হতে।
সিন্দুর চন্দন দিয়া পূজিল সব পূজারিণী;
কেহ বলে শ্রীনারায়ণ, কেহ বলে শ্যামা ইনি।
রাধা-প্রেমের গুণে মরে যে ছুঁইল হ’ল অবশ।
কেহ নাচে’ কেহ কাঁদে – অপরূপ সে আনন্দ-রস।
চাঁচর-কেশ ঝামর হ’ল, লাগিল কাজল মুখে তাই।
কে নিল কেড়ে বসন-ভূষণ, কিছুই যে মোর মনে নাই!
সবই রাধা-প্রেমের গুণে লো –
(এই নির্গুণ নারায়ণ হ’ল এই কালো রাখাল কালি হ’ল)
কোপ পরিহর গৌরী, ভয়ে মনি হেরিয়া –
গৌরীর মত তেজোময়ী মূরতি।
যদি কলঙ্কী হয়ে থাকি, শুদ্ধ প্রেমে দও
কলঙ্ক ধুয়ে দাও গো –
তোমার চরণে হোক্ সুমতি।
যেন রাধা জপমালা হয় শ্রীরাধা তন্ত্র, শ্রীরাধা মন্ত্র, রাধা যোগ, রাধা লয় –
রাধা নামে হই চোর, রাধা নামে কিশোর,
রাধা নামে নিপট কপট হই গো।
রাধা যদি পায়ে ঠেলে, চরণ-পরশ পাইনু বলে,
‘জয় রাধা’ কই গো? জয় শ্রীরাধা, জয় শ্রীরাধা, জয় শ্রীরাধা।
- ভাবসন্ধান: এই গানে কবি বৈষ্ণব সাধনার সর্বোচ্চ স্তর রাধাপ্রেম-কে কেন্দ্র করে এক গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার কাব্যিক রূপায়ণ করেছেন। এখানে রাধা কেবল শ্রীকৃষ্ণের প্রেয়সী নন; তিনি প্রেম, ভক্তি, আত্মবিসর্জন এবং ঈশ্বরলাভের সর্বোচ্চ আদর্শের প্রতীক।
গানের ভক্তসাধক, যিনি রাধাপ্রেমের রহস্য উপলব্ধি করতে গিয়ে নিজেই সেই প্রেমে নিমগ্ন ও রূপান্তরিত হয়ে পড়েন। গানের শুরুতে কবি কমলবনে ভোরবেলায় প্রস্ফুটিত পদ্মফুল দেখার জন্য যান। পদ্মফুল এখানে নির্মল প্রেম, পবিত্র হৃদয় ও কৃষ্ণ-চেতনার প্রতীক। কিন্তু সেখানে তিনি দেখেন, মৌমাছিরা ফুলের মধু আহরণের পরিবর্তে যেন হুল ফুটিয়ে বেড়াচ্ছে। এই চিত্রের মধ্য দিয়ে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, প্রেমের জগতে আনন্দের পাশাপাশি বেদনা, মিলনের পাশাপাশি বিরহও অবিচ্ছেদ্য। প্রকৃত প্রেম কখনও কেবল সুখের নয়; তার মধ্যে ত্যাগ, যন্ত্রণা ও আত্মবিসর্জনের পরীক্ষাও নিহিত থাকে। এরপর কবি বলেন, রাধার প্রেমকে তিনি প্রথমে সাধারণ বসন্তের ফুলের মতো কোমল ও আনন্দময় ভেবেছিলেন। কিন্তু সেই প্রেম স্পর্শ করতেই উপলব্ধি করেন, তা আসলে আগুনের ফুলকি—যা অহংকার, স্বার্থ ও পার্থিব আসক্তিকে দগ্ধ করে দেয়। রাধার প্রেম এমনই তীব্র যে, তার মহাভাবের অভিঘাতে সাধক আত্মবিস্মৃত হয়ে সমাধিস্থের মতো হয়ে পড়েন। এখানে ‘মহাভাব’ বৈষ্ণব দর্শনের সেই সর্বোচ্চ প্রেমাবস্থার প্রতীক, যেখানে ভক্ত নিজের সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে সম্পূর্ণরূপে ঈশ্বরপ্রেমে নিমগ্ন হন।
গানের পরবর্তী অংশে উল্লেখ করেছেন, সমাধিস্থ এমন সাধককে মানুষ দেবমূর্তি বলে মনে করে পূজা করতে শুরু করে। কেউ তাঁকে শ্রীনারায়ণ, কেউ বা শ্যামার রূপ বলে অভিহিত করে। এই বর্ণনার মধ্য দিয়ে নজরুল একটি গভীর আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশ করেছেন—নির্মল প্রেম মানুষকে এমন এক অবস্থায় উন্নীত করে, যেখানে ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে ভেদরেখা ক্ষীণ হয়ে আসে। প্রেমের প্রভাবে আশপাশের মানুষও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে; কেউ আনন্দে নাচে, কেউ অশ্রুসিক্ত হয়। এই সমষ্টিগত আবেগই ভক্তিরসের পরম প্রকাশ।
রাধাপ্রেমে নিমগ্ন হয়ে সাধক নিজের বাহ্যিক পরিচয়, সাজসজ্জা ও অহংবোধ সম্পূর্ণ ভুলে যান। তাঁর চুল এলোমেলো হয়ে যায়, মুখে কাজল লেগে থাকে, বসন-ভূষণ কোথায় হারিয়ে যায়, সে-সম্পর্কেও তাঁর কোনো স্মৃতি থাকে না। এই বিস্মৃতি আসলে আত্মবিসর্জনের প্রতীক। ভক্ত যখন প্রেমে সম্পূর্ণ আত্মহারা হন, তখন বাহ্যিক পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা কিংবা ব্যক্তিগত অহংকার—সবই অর্থহীন হয়ে পড়ে। এরপর কবি দেবী গৌরীর প্রতি বিনীত প্রার্থনা জানান। যদি কখনও তাঁর জীবনে কলঙ্ক বা অপরাধ থেকে থাকে, তবে নির্মল প্রেমের শক্তিতে যেন সেই কলঙ্ক ধুয়ে যায়। এখানে শুদ্ধ প্রেম-কেই আত্মশুদ্ধি ও মুক্তির একমাত্র পথ হিসেবে দেখানো হয়েছে। কবির আকাঙ্ক্ষা—তাঁর চিত্ত যেন সর্বদা কৃষ্ণমুখী থাকে এবং তাঁর বুদ্ধি ও কর্ম কৃষ্ণের চরণে নিবেদিত হয়।
গানের শেষাংশে রাধার নামকে সর্বোচ্চ সাধনামন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কবি চান, তাঁর জপ, তন্ত্র, মন্ত্র, যোগ এবং ধ্যান—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠুক রাধার নাম। এমনকি তিনি নিজেকে ‘রাধা নামে চোর’, ‘রাধা নামে কিশোর’, এমনকি ‘নিপট কপট’ বলতেও দ্বিধা করেন না। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, প্রেমের সাধনায় আত্মপরিচয়ের সমস্ত সীমা বিলীন হয়ে যায়; ভক্তের একমাত্র পরিচয় হয়ে ওঠে প্রেম। এমনকি রাধা যদি তাঁকে পদাঘাতও করেন, তবু সেই পদস্পর্শকেই তিনি সর্বোচ্চ কৃপা বলে গ্রহণ করবেন। তাই তাঁর শেষ উচ্চারণ—“জয় শ্রীরাধা”—কেবল একটি জয়ধ্বনি নয়; এটি প্রেম, আত্মসমর্পণ এবং ভক্তির চূড়ান্ত ঘোষণা।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জানুয়ারি (রবিবার ২৮ পৌষ ১৩৪৭) কলকাতা বেতার থেকে 'কলহ' নামক পালা-কীর্তন প্রচারিত হয়েছিল। এই পালা-কীর্তনে এই গানটি ব্যবহৃত হয়েছিল। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৪১ বৎসর ৭ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ২০১৪। পৃষ্ঠা: ৬০৫-৬০৬]
- বেতার: কলহ। পালা-কীর্তন । কলকাতা-ক। তৃতীয় অধিবেশন। সময়: ৭.৪০-৮.৩৯ [১২ জানুয়ারি ১৯৪১ (রবিবার ২৮ পৌষ ১৩৪৭)।
[সূত্র:- বেতার জগৎ।১২শ বর্ষ ১ম সংখ্যা। ১লা জানুয়ারি ১৯৪১, (বুধবার, ১৭ পৌষ ১৩৪৭)] পৃষ্ঠা: ৪৮
- The Indian-listener [1940, Vol VI, No 1. page 79
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। রাধা। বন্দনা