বঁধু আঁখি জলে কস্তুরী-চন্দন ঘষিনু (bodhu ankhi jole kostori-chondon ghoshinu)

বঁধু আঁখি জলে কস্তুরী-চন্দন ঘষিনু
শষ্যা বিছাইনু সোনার পালঙ্কে।
পথ চেয়ে নিশি মোর
ভোর চেয়ে নিশি মোর
ভোর হতে ওগো চোর
কেন এলে শ্রীঅঙ্গ মাখিয়া কলঙ্কে॥
মুখ দর্পণে দেখ হে, ওহে দর্পহারী
শ্রীমুখ একবার দর্পণে দেখ হে।
শ্যামল তনু কেন ঝামর ভেল
চাঁচর কুন্তল কেন এলোমেলো।
ললাটে মাখা কেন সিন্দুর রেখা
কপোলে লেগেছে কার কাজল লেখা।
তব হিয়ার কলঙ্ক কালি লোগেছে কপোলে হে
কেন আঁচলে মুখ মোছ
নিলাজের লাজ কভু মোছা কি যায় হে।
ও লাজ যাবে না ধুলে শত যমুনার জলে
নিলাজের লাজ কভু মোছা কি যায় হে।
হিয়ার মাঝারে কেন আলতার শোভা
শ্যামা ভেবে কে পূজেছে দিয়ে রাঙা জবা।
অলকা তিলক কে মুছে নিল বনমালা কেন ছিন্ন।
দশ নখ ক্ষত অরুণাধর ভুজে কঙ্কন আঁখি;
নীলাম্বর পরে এলে হলধর নাকি।
ছি ছি একি হেরি! ছি ছি এ কি হেরি!
হলে নব পরিণয় মালা বদল হয়
দেখিয়াছি ঘনশ্যাম প্রীতিতে রসময় বসন বদল হয়,
নূতন রীতি আজি হেরিলাম মাধব
শুনেছিনু পরমুখে পরপুরুষের মত তোমার রীতি হে।

তব পরাপর জ্ঞান নাই হে পরম পুরুষ
তব পরাপর জ্ঞান নাই শুনেছিনু পরমুখে
হে নিলাজ দেখে আজ হইল প্রতীতি হে, হইল প্রতীতি॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে রাধার প্রেম, অভিমান, ঈর্ষা, বিরহবেদনা এবং শ্রীকৃষ্ণের প্রতি একান্ত অধিকারের অনুভূতি মাধুর্যরসের অপূর্ব প্রকাশ লাভ করেছে। শ্রীকৃষ্ণের শরীরে অন্য প্রেমলীলার চিহ্ন দেখে রাধার হৃদয়ে যে দহন, মান, ঈর্ষা ও অভিযোগের জন্ম হয়েছে, কবি তা অত্যন্ত জীবন্ত ও কাব্যিক ভাষায় রূপায়িত করেছেন। তবে এই অভিযোগের অন্তরালে নিহিত রয়েছে গভীর প্রেম ও প্রিয়তমকে হারানোর আশঙ্কা।

    গানের শুরুতেই রাধা জানান, তিনি অশ্রুজলে কস্তুরী ও চন্দন ঘষে প্রিয়তমের জন্য স্নেহভরে প্রসাধনের আয়োজন করেছেন এবং সোনার পালঙ্ক সাজিয়ে সারা রাত তাঁর প্রতীক্ষায় কাটিয়েছেন। কিন্তু যাঁর জন্য এই আয়োজন, তিনি রাত্রি শেষে ভোরবেলায় উপস্থিত হয়েছেন। তাঁর শরীরে প্রেমলীলার নানা চিহ্ন দেখে রাধার মনে সন্দেহ জাগে যে, তিনি অন্য কারও সান্নিধ্য থেকে এসেছেন। তাই রাধার প্রশ্ন—প্রিয়তম কেন তাঁর শ্রীঅঙ্গে এই কলঙ্কের চিহ্ন ধারণ করে এসেছেন?

    গানটির পরবর্তী অংশে রাধা কৃষ্ণকে দর্পণে নিজের মুখ দেখার আহ্বান জানান। তাঁর এলোমেলো কেশ, মলিন দেহ, ললাটের সিঁদুররেখা, কপালের কাজল, বুকে আলতার দাগ, ছিন্ন বনমালা, নখের আঁচড় এবং অধরের ক্ষত—এসব দেখে রাধা একের পর এক প্রশ্নের মাধ্যমে তাঁর প্রতি অভিমান প্রকাশ করেন। এসব চিহ্ন অন্য এক নারীর সঙ্গে মিলনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এগুলো বাস্তব ঘটনার বিবরণ নয়; বরং প্রেমিকাকে কেন্দ্র করে জন্ম নেওয়া ঈর্ষা, মান ও অধিকারের কাব্যিক প্রকাশ। রাধা বলেন, মুখের দাগ আঁচল দিয়ে মুছে ফেললেও হৃদয়ের কলঙ্ক মুছে ফেলা যায় না। শত যমুনার জলে ধৌত করলেও যে লজ্জা ও অপরাধবোধ অন্তরে লেগে থাকে, তা দূর হয় না। এখানে ‘কলঙ্ক’ কোনো নৈতিক অপরাধের প্রতীক নয়; বরং প্রেমের বিশ্বাসভঙ্গের আশঙ্কা এবং প্রিয়তমকে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার অসহ্য মানসিক যন্ত্রণার রূপক। শেষাংশে রাধার অভিমান আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, মালাবদলের সঙ্গে বসনবদলের এই নতুন রীতি তিনি আগে কখনও দেখেননি। লোকমুখে শোনা কৃষ্ণের চপল স্বভাবের কথা আজ যেন সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে। ‘তব পরাপর জ্ঞান নাই’—এই উক্তির মাধ্যমে রাধা অভিযোগ করেছেন যে, কৃষ্ণ আপন-পরের ভেদ বোঝেন না; সকলের প্রতি সমান আকর্ষণে তিনি প্রেম বিলিয়ে বেড়ান। কিন্তু এই অভিযোগও শেষ পর্যন্ত গভীর প্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ। কারণ কৃষ্ণের প্রতি রাধার একান্ত অধিকারবোধ থেকেই তাঁর এই মান, ঈর্ষা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। 
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ২০৩৮। পৃষ্ঠা: ৬১৩-৬১৪]
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। রাধাকৃষ্ণলীলা। বিরহ

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।