বনমালার ফুল জোগালি বৃথাই বন-লতা (bonomalar ful jogali )

বনমালার ফুল জোগালি বৃথাই বন-লতা
বনের ডালায় কুসুম শুকায়, বনমালি কোথা॥
          শুকনো পাতার গুনে নূপুর
          চমকে ওঠে বনে ময়ূর,
রাস নাই আজ নিরাশ ব্রজে গভীর নীরবতা॥
যমুনা-জল উজান বেয়ে কদম-তলে আসি'
ভাটিতে যায় ফিরে, নাহি শু'নে শ্যামের বাঁশি।
          তমাল-ডালে ঝুলনা আর
          গোপীরা বাঁধেনি এবার,
শ্রাবণ এসে কেঁদে শুধায় ঘনশ্যামের কথা॥    

  • ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণের অনুপস্থিতিতে বৃন্দাবনের গভীর শূন্যতা ও বিরহবেদনার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। কবি দেখিয়েছেন, বনলতা যত্ন করে বনমালার জন্য ফুল সংগ্রহ করলেও সেই ফুল আর কারও গলায় শোভা পায় না; বনমালি শ্রীকৃষ্ণ সেখানে নেই। ফলে সাজানো ফুল শুকিয়ে যায় এবং সমস্ত আয়োজন অর্থহীন হয়ে পড়ে। এখানে শুকিয়ে যাওয়া ফুল অপূর্ণ প্রেম ও ব্যর্থ প্রতীক্ষার প্রতীক।

    শ্রীকৃষ্ণের অনুপস্থিতিতে প্রকৃতিও যেন তার স্বাভাবিক প্রাণশক্তি হারিয়েছে। শুকনো পাতার শব্দে ময়ূর চমকে ওঠে, কিন্তু আনন্দে আর নাচে না। ব্রজভূমির পথে নেই উৎসবের কোলাহল; সর্বত্র নেমে এসেছে গভীর নীরবতা ও বিষণ্নতা। একসময়ের প্রাণবন্ত বৃন্দাবন আজ নিরাশা ও নিঃসঙ্গতার আবরণে আচ্ছন্ন।

    যমুনার জল উজান বেয়ে কদমতলে এসে যেন শ্যামের বাঁশির সুর শোনার আশায় অপেক্ষা করে; কিন্তু সেই সুর না শুনে আবার ভাটির দিকে ফিরে যায়। তমালগাছে আর ঝুলনা বাঁধা হয় না, গোপীদের আনন্দ-উৎসবও বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থাৎ কৃষ্ণহীন বৃন্দাবনে সকল লীলা ও উৎসবের সমাপ্তি ঘটেছে।

    গানের শেষে শ্রাবণ মাসের আগমনও আনন্দ বয়ে আনতে পারে না। বরং বর্ষার অশ্রুসজল আবহ যেন ঘনশ্যামের সংবাদ জানতে চায়। প্রকৃতি, গোপী, যমুনা, বৃক্ষ—সবাই কৃষ্ণবিরহে সমানভাবে কাতর। এখানে শ্রাবণের কান্না আসলে বিরহিণী হৃদয়ের কান্নারই প্রতিধ্বনি।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। সঙ্গীত বিজ্ঞান প্রবেশিকা পত্রিকার [জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৬ (মে-জুন ১৯৩৯) সংখ্যায় গানটি প্রকাশিত হয়েছিল। এই স্বরলিপির পাদদেশে উল্লেখ আছে- 'এই গানখানি টুই রেকর্ডে কুমারী গীতা বসু কর্তৃক গীত হইয়াছে।' বাস্তবে এই গানটি টুইন রেকর্ড কোম্পানি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের জুন (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪৬) মাসে। সম্ভবত সঙ্গীত বিজ্ঞান প্রবেশিকা পত্রিকাটি 'জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৬' বিলম্বে প্রকাশিত হয়েছিল এবং বিলম্বে প্রকাশিত এই পত্রিকায় এই গানটি স্বরলিপি-সহ প্রকাশিত হয়েছিল। রেকর্ড প্রকাশের বিচারে এই গানটি নজরুলের ৪০ বৎসর ১ মাস বয়সে ও প্রকাশিত হয়েছিল বলে দাবি করা যায়।
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত,আদি স্বরলিপি সংগ্রহ। ২৪ সংখ্যক গান (নজরুল ইনস্টিটিউট, আশ্বিন ১৪০৬। অক্টোবর ১৯৯৯)। পৃষ্ঠা: ৬২-৬৩। [নমুনা]
     
  • পত্রিকা:
    • সঙ্গীত বিজ্ঞান প্রবেশিকা [জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৬ (মে-জুন ১৯৩৯)। কথা ও সুর: নজরুল ইসলাম। স্বরলিপিকার: অনাদিকুমার দস্তিদার। পৃষ্ঠা: ১০১- ১০৩] [নমুনা]
  • রেকর্ড: টুইন [জুন ১৯৩৯ (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪৬)। এফটি ১২৮৪২। শিল্পী: কুমারী গীতা বসু]
     
  • সঙ্গীতবিষয়ক তথ্যাবলি:
    • সুরকার: নজরুল ইসলাম।
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ:  র্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। বিরহ
    • সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
    • সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।